দক্ষিণ আমেরিকার রাজনীতিতে আবারও বড়সড় আলোড়ন। ভেনেজুয়েলায় এখনই কোনও নির্বাচন হতে দেবে না যুক্তরাষ্ট্র—এমনই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অনুপস্থিতিতে আপাতত দেশটির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা কার্যত আমেরিকার হাতেই থাকবে। নির্বাচনের আগে ভেনেজুয়েলাকে “সংস্কার” করা জরুরি বলে দাবি ট্রাম্পের, আর সেই প্রক্রিয়ায় সময় লাগতে পারে অন্তত দেড় বছর।
এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। একদিকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কারের নামে বিদেশি হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
কারাকাসে সেনা অভিযান ও মাদুরোর অপসারণ
মার্কিন সেনার সরাসরি অভিযানে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেনা অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তাঁর সরকারি বাসভবন থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযানের সময় কারাকাসে বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে, যদিও ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনও যুদ্ধ নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না। তাদের লড়াই মূলত মাদক চক্র ও আন্তর্জাতিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে। ট্রাম্পের দাবি, কিছু গোষ্ঠী ভেনেজুয়েলাকে ব্যবহার করে অপরাধীদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছে, আর সেই নেটওয়ার্ক ভাঙতেই এই অভিযান।
নির্বাচন স্থগিত, সংস্কারই প্রথম শর্ত
ভেনেজুয়েলায় আগামী এক মাস তো দূরের কথা, খুব শিগগিরই নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই—এ কথা স্পষ্ট করে দেন ট্রাম্প। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পক্ষে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট দেওয়া সম্ভব নয়। প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা—সবকিছুই ভেঙে পড়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “প্রথমে দেশটিকে ঠিক করতে হবে। তার পরেই নির্বাচন।” এই “ঠিক করা” বা সংস্কারের প্রক্রিয়াই এখন ভেনেজুয়েলার রাজনীতির কেন্দ্রে। মার্কিন প্রশাসনের মতে, এই সংস্কার শেষ না হলে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে পড়বে।
সংস্কারে কত সময় লাগবে? ট্রাম্পের হিসেব
সংস্কার প্রক্রিয়া কতদিন চলবে—এই প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প জানান, আনুমানিক ১৮ মাস সময় লাগতে পারে। তবে তিনি এটাও বলেন, পর্যাপ্ত অর্থ ও পরিকল্পনা থাকলে সময় কমতেও পারে। কিন্তু বাস্তবতা হল, এই সংস্কারের খরচ হবে বিপুল।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। তাঁর মতে, তেল সংস্থাগুলিই প্রথমে অর্থ বিনিয়োগ করবে। পরবর্তী সময়ে রাজস্ব বা অন্য উপায়ে তারা সেই অর্থ ফেরত পাবে। অর্থাৎ, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করেই সংস্কারের খরচ মেটানোর রূপরেখা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মাদুরোর বিচার ও নিউ ইয়র্কের আদালত
মার্কিন সেনার হাতে আটক হওয়ার পর নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে তাঁর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, মাদক পাচার ও আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগে এই বিচার চলছে বলে জানা গেছে।
মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার ভার সাময়িকভাবে অন্য হাতে দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তন দেশটির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যদিও তা কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেস
মাদুরোর অপসারণের পর ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেস অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। তাঁর নেতৃত্বেই আপাতত দেশটি চলবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বাস্তবে কতটা ক্ষমতা তাঁর হাতে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
কারণ ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, আপাতত নির্বাচন নয় এবং সংস্কারের পুরো প্রক্রিয়ার উপর নজরদারি থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কতটা থাকবে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
“এটা যুদ্ধ নয়”—ট্রাম্পের ব্যাখ্যা
কারাকাসে বোমা পড়া এবং সেনা অভিযানের পর অনেকেই একে সরাসরি যুদ্ধ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু ট্রাম্প এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র কোনও দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না।
তিনি বলেন, “আমাদের লড়াই মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে।” ট্রাম্পের দাবি, কিছু সরকার নিজেদের দেশের অপরাধীদের বিদেশে পাঠিয়ে সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে চায়, আর সেটাই যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, গণতন্ত্র ফেরানোর নামে এই পদক্ষেপ জরুরি। আবার অনেকে এটিকে স্পষ্টভাবে একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে সমালোচনা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সংস্কার ছাড়া নির্বাচন মানেই পুরনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোন পথে?
সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার সামনে এখন কঠিন সময়। একদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে বিদেশি নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা। সংস্কার সফল হলে দেশটি নতুন পথে এগোতে পারে, আবার ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর এটা স্পষ্ট, আগামী দেড় বছর ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে নির্বাচন বড় বিষয় নয়। বড় প্রশ্ন হল—এই সংস্কার আদৌ সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনবে, নাকি তা কেবল ক্ষমতার নতুন রূপ মাত্র হয়ে থাকবে।


