অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে কত খরচ হচ্ছে আমেরিকার?

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের কালো ছায়া ঘনিয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরিতা নতুন করে বিস্ফোরিত হয়েছে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। পাল্টা জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে। ফলে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে—এই সংঘাত কতদূর গড়াবে, আর এর আর্থিক ও মানবিক মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন। পরে পেন্টাগন জানায়, অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।

এই ঘোষণার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ইরানের ভেতরে ১,২৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে ১১টি ইরানি জাহাজ। বিমান হামলার পাশাপাশি সমুদ্র থেকে ছোড়া হয়েছে একের পর এক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। লক্ষ্যবস্তুতে ছিল পারমাণবিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো।

তুরস্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। শুধু মূল হামলাতেই নয়, অভিযানের আগে যুদ্ধবিমান ও নৌবহর মোতায়েনসহ প্রস্তুতিমূলক কাজে আরও প্রায় ৬৩ কোটি ডলার খরচ হয়েছে।

ভাবুন তো, মাত্র একদিনে এত টাকা খরচ! একটি দেশের বার্ষিক স্বাস্থ্য বা শিক্ষা বাজেটের সমান অর্থ কখনও কখনও একটি যুদ্ধের একদিনেই শেষ হয়ে যায়। এখানেই বোঝা যায় আধুনিক যুদ্ধ কতটা ব্যয়বহুল।

ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র আকাশ, সমুদ্র ও স্থলভিত্তিক অন্তত ২০টির বেশি অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানের তালিকায় রয়েছে বি-১, বি-২ স্টিলথ, এফ-৩৫, এফ-১৫ ও এফ-১৬ ফ্যালকন। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে আছে এমকিউ-৯ রিপার, হিমার্স (M142) এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। প্রতিরক্ষায় ব্যবহার হচ্ছে প্যাট্রিয়ট ও থাড সিস্টেম। নৌশক্তিতে যুক্ত রয়েছে বিমানবাহী রণতরি USS Gerald R. Ford এবং USS Abraham Lincoln।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Center for a New American Security–এর হিসাব বলছে, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৬৫ লাখ ডলার খরচ হয়। অর্থাৎ শুধু একটি রণতরি সচল রাখতেই প্রতিদিন বিশাল অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন।

ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ৭৮৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের তালিকায় রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এই ঘটনাটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এমন উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য এর মানে হলো অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং ভয়।

যুক্তরাষ্ট্রের Brown University–এর ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলকে প্রায় ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে ওয়াশিংটন।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে সহায়তা দিতে গিয়ে মার্কিন করদাতাদের অতিরিক্ত ৯৬৫ কোটি থেকে ১,২০৭ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। ফলে অঞ্চলজুড়ে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩৭৭ কোটি ডলারে।

এখানে বিষয়টি শুধু সামরিক শক্তির নয়, অর্থনীতিরও। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই ব্যয় আরও কয়েকগুণ বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে মার্কিন অর্থনীতি ও করদাতাদের ওপর।

স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবেলের মতে, পেন্টাগন এখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার। সেটিকে দেড় ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাজেট বাড়ানো মানেই ভবিষ্যতে আরও সামরিক প্রস্তুতি ও ব্যয় বৃদ্ধি। আর সেটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, যত দিন প্রয়োজন তত দিন অভিযান চলবে। তবে তিনি প্রাথমিকভাবে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ব্যয় কয়েকগুণ বাড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও দেশ এতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এমন পরিস্থিতি পুরো অঞ্চলে একটি বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এতে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক শক্তি, জোট রাজনীতি এবং বৈশ্বিক কৌশলগত স্বার্থ।

যুদ্ধ মানেই শুধু বোমা আর গোলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থনৈতিক চাপ, মানবিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার ব্যয় তারই একটি প্রমাণ।

এখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে—এই সংঘাত কি দ্রুত থামবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সূচনা ঘটবে? সময়ই তার উত্তর দেবে।

সূত্র: আল জাজিরা

লেটেস্ট আপডেট

আকাশে বিস্ফোরণ, তবুও স্বাভাবিক জীবন? দুবাই থেকে প্রবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা

ইরানের আত্মঘাতী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর উপসাগরজুড়ে যখন...

হরমুজ প্রণালী বন্ধ! ইউরোপে গ্যাসের দাম ৪৫% লাফ—বিশ্ব অর্থনীতি কি নতুন সংকটে?

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছাতেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে শুরু...

বর্ষীয়ান অভিনেতা বৈদ্যনাথ সাহার শেষকৃত্য সম্পন্ন

বর্ষীয়ান অভিনেতা বৈদ্যনাথ সাহা (৭৩) আর নেই। মঙ্গলবার (৩...

১১ জনের মৃত্যুর সেই মাঠেই আইপিএল ফাইনাল! চিন্নাস্বামীর ভাগ্য বদলের গল্প

বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম আবারও শিরোনামে। এক বছর আগে...

‘সেই রাতে আমরা এক হয়েছিলাম’ : বিজয়-রশ্মিকার স্বপ্নের সঙ্গীত ও বিয়ের অদেখা মুহূর্ত!

দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি বিজয় দেবরাকোন্ডা ও...

বাছাই সংবাদ

আকাশে বিস্ফোরণ, তবুও স্বাভাবিক জীবন? দুবাই থেকে প্রবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা

ইরানের আত্মঘাতী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর উপসাগরজুড়ে যখন...

হরমুজ প্রণালী বন্ধ! ইউরোপে গ্যাসের দাম ৪৫% লাফ—বিশ্ব অর্থনীতি কি নতুন সংকটে?

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছাতেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে শুরু...

বর্ষীয়ান অভিনেতা বৈদ্যনাথ সাহার শেষকৃত্য সম্পন্ন

বর্ষীয়ান অভিনেতা বৈদ্যনাথ সাহা (৭৩) আর নেই। মঙ্গলবার (৩...

১১ জনের মৃত্যুর সেই মাঠেই আইপিএল ফাইনাল! চিন্নাস্বামীর ভাগ্য বদলের গল্প

বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম আবারও শিরোনামে। এক বছর আগে...

‘সেই রাতে আমরা এক হয়েছিলাম’ : বিজয়-রশ্মিকার স্বপ্নের সঙ্গীত ও বিয়ের অদেখা মুহূর্ত!

দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি বিজয় দেবরাকোন্ডা ও...

ইউনূস নিজেকে ‘ভিভিআইপি’ ঘোষণা! গেজেট কোথায় গেল?

বাংলাদেশের সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস...

দুদক চেয়ারম্যানের হঠাৎ পদত্যাগ! কী ঘটছে দুর্নীতি দমন কমিশনে?

দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক এর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ...

মাটি বিক্রির অভিযোগে ধরা! চৌগাছায় পুকুর খননে বড় শাস্তি

যশোরের চৌগাছায় অনুমতি ছাড়া পুকুর খনন করার অভিযোগে মিলন...

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি