আকাশে উড়ছিল সব ঠিকঠাক। যাত্রীদের কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে মেঘ দেখছিলেন, কেউ হয়তো গল্পে মশগুল। হঠাৎ সেই স্বাভাবিক যাত্রাই বদলে গেল রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতায়। ৫০ জন যাত্রী ও ৫ জন বিমানকর্মী নিয়ে উড়ে যাওয়া একটি বিমান জরুরি অবতরণ করতে গিয়ে রানওয়ে ছাড়িয়ে সমুদ্রসৈকতের বালিতে গিয়ে আটকে যায়।
সামনে ছিল নীল জলরাশি। কয়েক সেকেন্ডের এদিক-ওদিক হলেই হয়তো বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই নিরাপদে রক্ষা পান।
এই ঘটনা ঘটেছে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুর এডেন অ্যাডে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আর এই নাটকীয় পরিস্থিতিতে পাইলটের উপস্থিত বুদ্ধি ও দ্রুত সিদ্ধান্তই বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করেছে।
বিমানটি নির্ধারিত সময়েই রানওয়ে ছেড়ে আকাশে ওড়ে। প্রথমে কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। কিন্তু উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর পাইলট বুঝতে পারেন যে বিমানে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই ধরনের সমস্যা মাঝআকাশে অবহেলা করলে তার ফল ভয়ঙ্কর হতে পারে।
পাইলট তখনই সিদ্ধান্ত নেন, ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত বিমানবন্দরে ফিরে গিয়ে জরুরি অবতরণ করতে হবে। কারণ মাঝআকাশে সমস্যা বাড়লে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তিনি বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারে যোগাযোগ করে জরুরি অবতরণের অনুমতি চান।
পাইলট দ্রুত বিমান ঘুরিয়ে ফের রানওয়ের দিকে আনেন। বিমানটি অবতরণও করে। কিন্তু সমস্যার এখানেই শেষ হয়নি। অবতরণের পর রানওয়ে দিয়ে ছুটতে ছুটতে বিমানটি গতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। ফলে সেটি রানওয়ে ছাড়িয়ে বিমানবন্দরের সীমানা পার হয়ে যায়।
এই সময় বিমানবন্দরের কর্মীরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কারণ সামনে ছিল সমুদ্র। বিমানটি যদি সরাসরি গভীর জলে ঢুকে যেত, তাহলে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারত।
বিমানটি রানওয়ে ছেড়ে সমুদ্রসৈকতের বালির উপর দিয়ে ঘষটে যেতে থাকে। চাকা বালিতে ডুবে যেতে থাকে। সামনে কয়েক গজ দূরেই ছিল নীল জলরাশি। ঠিক যেখানে বালি আর সমুদ্রের জল মিশেছে, সেই জায়গাতেই গিয়ে বিমানটি থেমে যায়। বালিতে আটকে পড়ায় সেটি আর সামনে এগোতে পারেনি।
ভাবুন তো, আপনি যদি সেই বিমানে থাকতেন! হঠাৎ ঝাঁকুনি, তারপর জানালার বাইরে সমুদ্র। মুহূর্তেই বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যেত। কিন্তু সৌভাগ্যবশত এই ঘটনায় কোনও যাত্রী বা বিমানকর্মীর প্রাণহানি বা গুরুতর আঘাতের খবর পাওয়া যায়নি।
বিমানটি বালিতে আটকে যাওয়ায় গভীর জলে ঢোকার আগেই থেমে যায়। ফলে সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। পরে সবাইকে নিরাপদে বিমান থেকে নামানো হয়।
স্টারস্কাই বিমানপরিবহন সংস্থা এক বিবৃতিতে জানায়, সব যাত্রী ও ক্রু সদস্য নিরাপদ আছেন। দ্রুত উদ্ধার ও সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই পুরো ঘটনায় পাইলটের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যান্ত্রিক ত্রুটি বুঝে সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রেখে অবতরণ করানো—এই দুই পদক্ষেপই বহু প্রাণ বাঁচিয়েছে।
বিমান চালানো মানে শুধু আকাশে উড়ে যাওয়া নয়। প্রতিটি মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হয়। এখানে কয়েক সেকেন্ড দেরি হলে ফল অন্যরকম হতে পারত। তাই যাত্রী ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সকলেই পাইলটকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন।
এডেন অ্যাডে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সোমালিয়ার অন্যতম প্রধান বিমানবন্দর। এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই বিমানবন্দর নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রানওয়ে ছাড়িয়ে বিমান সরাসরি সমুদ্রসৈকতে পৌঁছে যাওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল কি না। যদিও দ্রুত পদক্ষেপের ফলে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে, তবু ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনেকেই ভাবেন, জরুরি অবতরণ মানেই বড় বিপদ। আসলে তা নয়। বিমান চলাচলে জরুরি অবতরণ একটি নিয়মিত ও প্রশিক্ষিত প্রক্রিয়া। পাইলটরা বিশেষ প্রশিক্ষণ পান, যাতে যান্ত্রিক সমস্যা, আবহাওয়ার পরিবর্তন বা অন্য কোনও বিপদে দ্রুত ও নিরাপদে বিমান নামাতে পারেন।
এই ঘটনায়ও সেই প্রশিক্ষণেরই ফল মিলেছে। সমস্যা বুঝেই পাইলট সময় নষ্ট করেননি। দ্রুত যোগাযোগ, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং সাহসী পদক্ষেপ—এই তিনটি বিষয়ই যাত্রীদের নিরাপদে রাখে।
একটা সময় বিমানবন্দরের কর্মীরা প্রায় প্রমাদ গুনছিলেন। কারণ বিমানটি সোজা সমুদ্রের দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু গভীর জলে ঢোকার আগেই সেটি বালিতে আটকে যায়। সেই মুহূর্তে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।
এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, আকাশপথে ভ্রমণ যতই নিরাপদ হোক, প্রতিটি যাত্রার পেছনে থাকে কঠোর প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি আর মুহূর্তের সিদ্ধান্ত। আর সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে বড় বিপদও এড়ানো যায়।
মোগাদিসুর সমুদ্রসৈকতে বালিতে আটকে থাকা সেই বিমান এখন শুধু একটি ছবি নয়, বরং এক সাহসী সিদ্ধান্তের প্রতীক। যেখানে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৫০টি প্রাণ রক্ষা পেয়েছে।


