স্পেন যেন এক রাতেই থমকে গেছে। আধুনিক রেল যোগাযোগের জন্য পরিচিত দেশটিতে ঘটে গেল এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা। দক্ষিণ স্পেনে দ্রুতগতির দু’টি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বহু মানুষ। কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো স্পেনজুড়ে।
কোথায় এবং কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটে
স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলের কর্ডোবা প্রদেশের কাছে আদামুজ নামের একটি এলাকার পাশে এই দুর্ঘটনা ঘটে। রেল নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফ জানিয়েছে, মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি দ্রুতগতির ট্রেন হঠাৎ লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে পাশের আরেকটি লাইনে ঢুকে যায়। ঠিক সেই সময় ওই লাইনে মাদ্রিদ থেকে হুয়েলভাগামী আরেকটি দ্রুতগতির ট্রেন চলছিল। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে যায় মুখোমুখি সংঘর্ষ। তীব্র গতির কারণে দু’টি ট্রেনই ভয়াবহভাবে দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
নিহত ও আহতদের সর্বশেষ তথ্য
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। ৩০ জনের বেশি মানুষ গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। আন্দালুসিয়ার জরুরি সেবা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মোট আহতের সংখ্যা অন্তত ৭৩ জন।
আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাই কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
কেন এত ভয়াবহ হলো দুর্ঘটনাটি
পরিবহনমন্ত্রী পুয়েন্তে এই ঘটনাকে “খুবই অস্বাভাবিক” বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ট্রেনটি সোজা লাইনে চলার সময় লাইনচ্যুত হয়েছে, যা সাধারণত ঘটে না। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই রেললাইনটি গত বছরের মে মাসেই নতুন করে সংস্কার করা হয়েছিল।
দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। প্রাথমিকভাবে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি, মানবিক ভুল কিংবা সিগন্যাল ব্যবস্থার সমস্যার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হতে অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রেন দু’টিতে কতজন যাত্রী ছিলেন
মালাগা থেকে যাত্রা করা ট্রেনটি পরিচালনা করছিল বেসরকারি রেল কোম্পানি ইরিও। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ওই ট্রেনে প্রায় ৩০০ জন যাত্রী ছিলেন। অন্যদিকে, মাদ্রিদ থেকে হুয়েলভাগামী ট্রেনটি পরিচালনা করছিল রাষ্ট্রায়ত্ত রেল কোম্পানি রেনফে। সেই ট্রেনে ছিলেন প্রায় ১০০ জন যাত্রী।
দুটি ট্রেনেই যাত্রী সংখ্যা বেশি থাকায় হতাহতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ভয়ংকর মুহূর্ত
আরটিভিই-এর সাংবাদিক সালভাদোর জিমিনেস ছিলেন দুর্ঘটনাকবলিত একটি ট্রেনে। তিনি বলেন, ধাক্কাটি ছিল ভূমিকম্পের মতো। তাঁর ভাষায়, “আমি প্রথম বগিতে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো যেন মাটি কাঁপছে। তারপরই ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে যায়।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে অনেক যাত্রী বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেই ভীতিকর অভিজ্ঞতা তিনি কোনো দিন ভুলতে পারবেন না বলে উল্লেখ করেন।
উদ্ধারকাজে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ
দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকাজ শুরু হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছায় স্প্যানিশ রেড ক্রস, ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি সেবার সদস্যরা। তবে উদ্ধারকাজ সহজ ছিল না।
কর্ডোবার ফায়ার সার্ভিস প্রধান ফ্রান্সিসকো কারমোনা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরটিভিইকে জানান, ট্রেনের দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অংশের কারণে জীবিত মানুষ ও মরদেহ উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “কাউকে জীবিত উদ্ধার করতে গিয়ে আমাদের আগে একজন মৃত ব্যক্তিকে সরাতে হয়েছে। কাজটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ও মানসিকভাবে কঠিন।”
যাত্রীদের পরিবারে চরম উৎকণ্ঠা
দুর্ঘটনার পর তথ্যের অভাবে নিহত ও আহতদের স্বজনরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েন। রেড ক্রস জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রেড ক্রসের কর্মকর্তা মিগেল আংহেল রদ্রিগ্রেজ বলেন, “পরিবারগুলো ভয়াবহ দুশ্চিন্তায় আছে। এই সময়টা তাদের জন্য খুব কষ্টের।”
আন্দালুসিয়ার জরুরি সংস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের অনুরোধ করেছে, তারা যেন পোস্ট দিয়ে জানায় যে তারা নিরাপদ ও জীবিত আছেন।
ট্রেন চলাচল বন্ধ, বিশেষ ব্যবস্থা স্টেশনগুলোতে
দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে সব ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্তত সোমবার পর্যন্ত এই রুটে ট্রেন চলবে না।
নিহত ও আহতদের স্বজনদের জন্য মাদ্রিদের আতোচা, সেভিল, কর্ডোবা, মালাগা ও হুয়েলভা স্টেশনে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের সহায়তার জন্য স্টেশনগুলো খোলা রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের প্রযুক্তিগত তথ্য
ইতালির রেল কোম্পানি ফেরোভিয়ে দেল্লো স্তাতোর একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার শিকার ট্রেনটি ছিল ফ্রেচিয়া ১০০০ মডেলের। এই ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম।
এত উন্নত প্রযুক্তির ট্রেনে এমন দুর্ঘটনা হওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রাষ্ট্রপ্রধান ও আন্তর্জাতিক মহলের শোকবার্তা
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই ঘটনাকে “গভীর শোকের এক রাত” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
স্পেনের রাজা ফেলিপে ষষ্ঠ ও রানি লেতিসিয়াও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজপ্রাসাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হচ্ছে এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হচ্ছে।
এই দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন। ম্যাক্রঁ বলেন, “নিহতদের পরিবার ও পুরো স্পেনের মানুষের পাশে আছি।”
অতীতের ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার স্মৃতি
এই দুর্ঘটনা স্পেনবাসীর মনে আবারও ফিরিয়ে এনেছে ২০১৩ সালের ভয়াবহ স্মৃতি। সে বছর গালিসিয়া অঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ত দ্রুতগতির ট্রেন দুর্ঘটনায় ৮০ জন নিহত ও ১৪০ জন আহত হয়েছিলেন। সেটিই ছিল স্পেনের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা।
শোক, প্রশ্ন আর অপেক্ষা
স্পেনে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবহন দুর্ঘটনা নয়। এটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা এবং রেল ব্যবস্থার তদারকি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তদন্তের ফলাফল কী আসে, তা এখন দেখার বিষয়। তবে আপাতত পুরো স্পেন শোকস্তব্ধ। নিহতদের পরিবার স্বজন হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়েছে। আহতরা লড়ছেন জীবনের সঙ্গে। আর একটি দেশ অপেক্ষা করছে সত্যের, ন্যায়বিচারের এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা আর না ঘটার নিশ্চয়তার।


