মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিটি দিনই নতুন খবর তৈরি করছে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান সর্বোচ্চ চার সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়।
ওয়াশিংটনের ক্ষমতার করিডোরে বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। হোয়াইট হাউস সূত্র বলছে, সামরিক চাপ বজায় রেখেই কূটনৈতিক পথ খোলা রাখতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই “চাপ ও আলোচনা”—এই দুই কৌশলের মিশেলে এগোচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেল-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হিসেব কষে মাঠে নেমেছে। তার দাবি, পুরো সামরিক অভিযান শেষ করতে চার সপ্তাহ বা তারও কম সময় লাগতে পারে।
তার কথায় বোঝা যায়, ওয়াশিংটন এই অভিযানে দ্রুত ফল চাইছে। ট্রাম্প বলেন, ইরান ভৌগোলিকভাবে বড় এবং সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশ হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান এগোলে সময় বেশি লাগার কথা নয়।
এই বক্তব্যের ভেতরে একটা বার্তা স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র দেখাতে চাইছে যে তারা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে আছে।
সাংবাদিকরা যখন জানতে চান, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার সুযোগ আছে কি না—ট্রাম্পের উত্তর ছিল কিছুটা কৌশলী। তিনি বলেন, ইরান কথা বলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে, কিন্তু সময় নিয়ে তার আক্ষেপ রয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানের আগেই কথা বলা উচিত ছিল। এখন তারা দেরি করে ফেলেছে। তবু পুরোপুরি দরজা বন্ধ করেননি তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা আসলে চাপ তৈরির কৌশল। একদিকে সামরিক অভিযান, অন্যদিকে আলোচনার ইঙ্গিত—এই দুইয়ের সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে টেবিলে আনতে চাইছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-এর মৃত্যুর পর। তার শূন্যস্থান পূরণ করতে নতুন নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন আয়াতোল্লা আলিরেজা আরাফি।
এই পরিবর্তনকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ওয়াশিংটন। কারণ নেতৃত্ব বদল মানে নীতিতেও কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী। তবে একই সঙ্গে সামরিক চাপ কমানোর কোনো ইঙ্গিত এখনো দেওয়া হয়নি।
কূটনৈতিক কথা যতই উঠুক, বাস্তবে কিন্তু অভিযান থেমে নেই। ইরান-এর বিভিন্ন স্থানে মার্কিন সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্প নিজেই পরিষ্কার করেছেন—আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও সামরিক অভিযান চলবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র “প্রথমে চাপ, পরে আলোচনা” কৌশলেই এগোচ্ছে।
এটা অনেকটা এমন—কেউ দরজা খুলে কথা বলতে রাজি, কিন্তু হাত থেকে লাঠিটা এখনো নামায়নি।
উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে যখন শনিবার সকালে তেহরান-এ খামেনেইয়ের দপ্তর লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যৌথভাবে বড় ধরনের হামলা চালায়।
সেই হামলায় খামেনেইসহ ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন বলে দাবি করা হয়। এই ঘটনাই পুরো অঞ্চলে আগুনে ঘি ঢেলে দেয়।
এরপর থেকেই পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়।
হামলার জবাব দিতে দেরি করেনি ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে তারা আক্রমণ চালায়। পাশাপাশি ইজরায়েলের দিকেও হামলা বাড়ানো হয়।
রবিবার ইরান দাবি করে, তারা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিঙ্কন-এর দিকে চারটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি নিয়ে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে।
ইরানের হামলার জবাবে ট্রাম্প বেশ কঠোর সুরে কথা বলেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের নৌবাহিনীকে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে।
তিনি বলেন, ইরানের অন্তত নয়টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে এবং তাদের নৌ সদর দপ্তরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র শক্ত অবস্থান দেখাতে চাইছে—দেশীয় রাজনীতি হোক বা আন্তর্জাতিক মঞ্চ, দুই জায়গাতেই।
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু দুই দেশের লড়াই নয়; পুরো মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য এতে জড়িয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সত্যিই চার সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শেষ হয়, তাহলে পরবর্তী ধাপ হবে কূটনৈতিক দরকষাকষি। আর যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
এখানে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—নতুন ইরানি নেতৃত্ব কতটা নমনীয় অবস্থান নেয়, সেটাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
এই মুহূর্তে তিনটি সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে।
প্রথমত, দ্রুত সামরিক সাফল্য দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে ইরানকে আনতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পাল্টা হামলা বাড়লে সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে গড়াতে পারে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লে দুই পক্ষই ধীরে ধীরে কূটনৈতিক পথে ফিরতে পারে।
বাস্তবতা হলো—মাঠের পরিস্থিতি যেমন বদলাবে, সিদ্ধান্তও তেমন বদলাবে।
পুরো ঘটনাটা এখন অনেকটা দাবা খেলার মতো। এক চালের জবাবে আরেক চাল। ট্রাম্প একদিকে চার সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, অন্যদিকে নতুন ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিতও রেখেছেন।
মানে, দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়—কিন্তু চাপও কমছে না।
আগামী কয়েক সপ্তাহই বলে দেবে, এই উত্তেজনা যুদ্ধেই গড়াবে নাকি শেষ পর্যন্ত কূটনীতির টেবিলে বসবে দুই পক্ষ।



