ব্রিটেনের রাজনীতি বর্তমানে এক অভূতপূর্ব মোড়ে দাঁড়িয়েছে। অভিবাসন ইস্যু থেকে শুরু করে দক্ষিণপন্থার উত্থান—সবকিছুর মাঝখানে আছেন বিতর্কিত নেতা টমি রবিনসন। তাঁর ডাকেই সম্প্রতি লন্ডনের রাস্তায় লক্ষ মানুষের ভিড় জমে, যা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে—তিনি কি অপরাধী, নাকি এক জননেতা?
লন্ডনের অভিবাসনবিরোধী মিছিল: এক রাজনৈতিক সতর্কবার্তা
শনিবার লন্ডনের বুকে লক্ষ মানুষের অভিবাসনবিরোধী মিছিল সরকারের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা সরব হয়েছেন অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে, আর রবিনসনের ডাকেই এই বিপুল জমায়েত সম্ভব হয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক অতীতের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় সমাবেশ।
অভিবাসন ইস্যুতে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভই যেন মানুষের ভিড়ের মূল চালিকা শক্তি। সরকারের নীতির প্রতি অসন্তোষই রবিনসনের আন্দোলনের পেছনে প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক আবহ: লেবারের ভাঁটার টান ও দক্ষিণপন্থার উত্থান
সুনক সরকারের পতনের পর লেবার সরকার ক্ষমতায় এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সেই জনসমর্থনে ভাঁটা পড়ে। অর্থনৈতিক নীতি, করব্যবস্থা এবং সামাজিক ইস্যুতে সরকারের ব্যর্থতা মানুষের ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে।
এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটেনে মাথা তুলছে দক্ষিণপন্থা। রিফর্ম পার্টি অভিবাসনবিরোধী ভোট টেনে নিচ্ছে, আর কনজার্ভেটিভরা সমর্থন হারাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতেই রবিনসন নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পাচ্ছেন।
রবিনসনের রাজনৈতিক যাত্রা: ‘ইংলিশ ডিফেন্স লিগ’ থেকে আজকের অবস্থান
২০০৯ সালে টমি রবিনসন ‘ইংলিশ ডিফেন্স লিগ’ প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও ২০১৩ সালে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন, তবুও সেই সংগঠনের আন্দোলন বারবার সংঘর্ষ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রবিনসন প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে তিনি ব্রিটেনে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সরকারের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাঁর বক্তব্য ও আন্দোলন মূলত এই ইস্যুগুলোকেই ঘিরে আবর্তিত হয়।
অপরাধ ও বিতর্ক: টমি রবিনসনের অন্ধকার দিক
রবিনসনের জীবন শুধু রাজনৈতিক মঞ্চেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একাধিক অপরাধের অভিযোগ।
- মারধর ও জমানত জালিয়াতি
- আদালত অবমাননা
- মানহানিকর মন্তব্য
২০১৮ সালে আদালতে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের জন্য তিনি কারাদণ্ড পান। ২০২৪ সালে একজন সিরিয়ান শরণার্থীর সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করায় আবারও ১৮ মাসের সাজা হয়। বিচারকের মতে, তাঁর মধ্যে অনুশোচনা দেখা যায়নি।
অর্থনৈতিক সংকট ও দেউলিয়াত্ব
২০২১ সালে রবিনসন নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হন। সমর্থকদের কাছ থেকে বিশাল অনুদান সংগ্রহ করলেও সেই অর্থ জুয়ায় হারানোর অভিযোগ স্বীকার করেন তিনি। এ ঘটনা তাঁর ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হানে।
জনসমর্থন: বিতর্কের মাঝেও জনপ্রিয়তা
আইনি ঝামেলা ও আর্থিক সমস্যার মাঝেও রবিনসনের জনপ্রিয়তা কমেনি। সাম্প্রতিক মিছিলই প্রমাণ করেছে যে তিনি এখনও ব্রিটিশ জনতার এক বড় অংশের কাছে ‘জননেতা’।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্রিটেনে দক্ষিণপন্থার ক্রমবর্ধমান উত্থানই রবিনসনের শক্তি। লেবার ও কনজার্ভেটিভদের ব্যর্থতাকে পুঁজি করেই তিনি নিজের রাজনৈতিক জমি শক্ত করছেন।
রবিনসন কি অপরাধী, নাকি নেতা?
টমি রবিনসনের জীবন কাহিনি এক অদ্ভুত মিশ্রণ—অপরাধের ইতিহাস, দেউলিয়াত্ব, বিতর্ক, আবার একই সঙ্গে জনসমর্থন ও রাজনৈতিক প্রভাব। তাঁর ডাকেই লন্ডনের রাস্তায় লাখো মানুষ নেমে আসা প্রমাণ করে যে তিনি শুধু একজন বিতর্কিত ব্যক্তি নন, বরং ব্রিটেনের রাজনীতিতে পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠছেন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—তিনি কি সত্যিই জনগণের নেতা, নাকি কেবলমাত্র বিতর্কের মাধ্যমে আলোচনায় থাকা এক অপরাধী? ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে।


