মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত ৫০ শতাংশ বাণিজ্য শুল্কের ফলে ভারতের রপ্তানি খাত জুড়ে নেমে এসেছে আতঙ্কের ছায়া। বিশেষ করে পোশাক শিল্প, হীরা ও গহনা এবং চিংড়ি রপ্তানিকারকরা পড়েছেন বিপাকে। কর্মসংস্থান হুমকির মুখে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নতুন অর্ডার, আর ব্যবসায়ীরা ভাবছেন—“কর্মীদের বেতন দেব কীভাবে?”
ভারতের অন্যতম পোশাক রপ্তানি কেন্দ্র তিরুপ্পুর। এখানে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের রেডি-টু-ওয়্যার পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়। কিন্তু ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পর থেকেই গার্মেন্ট মালিকদের ঘরে নেমে এসেছে হতাশার সুর।
এন কৃষ্ণমূর্তির কারখানায় একসময় গমগম করতো ২০০টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেলাই মেশিন। এখন চলছে হাতে গোনা কয়েকটি। শিশুদের পোশাক তৈরির শেষ অর্ডার শেষ হলেই কাজ বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তার মতে, সেপ্টেম্বরের পর থেকে ব্যবসা কার্যত শূন্যে নামবে। সম্প্রতি নতুন ২৫০ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও শুল্ক সংকটের কারণে তাদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। ফলে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা থমকে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সংকুচিত হলে গার্মেন্ট শিল্পীরা স্থানীয় বাজার এবং দীপাবলির মৌসুমকে ঘিরেই টিকে থাকার চেষ্টা করবেন। তবে তাতে আন্তর্জাতিক ক্ষতি পূরণ হবে না।
তিরুপ্পুরের আরেক কারখানা মালিক শিবা সুব্রামণিয়ম জানান, তার কাছে প্রায় এক মিলিয়ন ডলারের ইনভেন্টরি জমে আছে যা মার্কিন ক্রেতাদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এখন তা বিক্রির কোনো সম্ভাবনা নেই।
তার উদ্বেগ-“কর্মীদের বেতন দেব কীভাবে? উৎপাদন চেন বন্ধ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো শিল্পই ধ্বংস হয়ে যাবে।”
শুল্কের কারণে ভারতীয় পোশাকের দাম অন্যান্য এশীয় দেশের তুলনায় বেশি হয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ-আগে ১০ ডলারে বিক্রি হওয়া একটি শার্ট এখন দাঁড়াবে ১৬.৪ ডলারে।একই শার্ট চীন থেকে আসে ১৪.২ ডলারে, বাংলাদেশ থেকে ১৩.২ ডলারে এবং ভিয়েতনাম থেকে ১২ ডলারে।এমনকি যদি শুল্ক কমিয়ে ২৫ শতাংশও করা হয়, তবুও ভারত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকবে।
মুম্বাই ও সুরাট ভারতের হীরা শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। প্রতি বছর এখান থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের রত্ন ও গহনা রপ্তানি হয়, যার ৯০ শতাংশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যায়।
ক্রিয়েশন জুয়েলারির মালিক আদিল কোতওয়াল জানান, তার ব্যবসার লাভের মার্জিন মাত্র ৩-৪ শতাংশ। সেখানে ১০ শতাংশ শুল্কও টিকে থাকা কঠিন করে তুলছে। ইতিমধ্যে মার্কিন অর্ডার কমে গেছে, ফলে শত শত শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন।
সুরাটের অনেক কারখানায় মাসে মাত্র ১৫ দিন কাজ হচ্ছে। এক সময়ের ব্যস্ত ইউনিটগুলোতে এখন ধুলো জমছে, কর্মীদের ছাঁটাই করা হচ্ছে, আর শ্রমিকরা জানেন না তাদের ভবিষ্যৎ কী।
ভারত বিশ্বের অন্যতম চিংড়ি রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নতুন শুল্কে চিংড়ির মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
এর ফলে—দাম প্রতি কেজি ০.৬২ থেকে ০.৭২ ডলার পর্যন্ত কমেছে।প্রায় পাঁচ লাখ চিংড়ি চাষি এবং আরও ২৫ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।হ্যাচারিগুলো লার্ভা উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।এ অবস্থায় মার্কিন ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিচ্ছেন না। ফলে ব্যবসায়ীরা দ্বিধায় আছেন-কীভাবে এগোবেন।
ভারত সরকার ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন-কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক স্থগিত।অন্যান্য দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা যতদিন চলবে, ভারতের রপ্তানি খাত ততদিন চাপে থাকবে।
‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’-এর অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে মার্কিন ক্রেতারা মেক্সিকো, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকবেন। এতে ভারতের দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা মার্কেট শেয়ার কয়েক মাসেই হারিয়ে যেতে পারে।
এশিয়া গ্রুপ অ্যাডভাইজরির গোপাল নাদুর মতে, ভারতের সামনে এখন একমাত্র পথ হলো—আত্মনির্ভরতা বাড়ানো, রপ্তানির বাজার, বৈচিত্র্যময় করা, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে বিকল্প বাজার তৈরি করা।


