সময় যত এগোচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ততই বাড়ছে। পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বার্তাসংস্থা Reuters এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের জন্য বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহব্যাপী অভিযান চালানোর মতো কৌশলগত পরিকল্পনাও নাকি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
চলুন বিষয়টা সহজ করে বুঝি—এটা কেবল হুমকি নয়, বাস্তব প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই কারণেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট Donald Trump নির্দেশ দিলেই মার্কিন বাহিনী অভিযান শুরু করবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরিকল্পনাটি এতটাই সংবেদনশীল যে এটি প্রকাশ পেলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
পেন্টাগন ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার সেনা, আধুনিক যুদ্ধবিমান, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ উন্নত অস্ত্রশস্ত্র পাঠানো হচ্ছে। বিষয়টি অনেকটা এমন—কেউ যদি বলে “আমি প্রস্তুত”, কিন্তু সঙ্গে পুরো যুদ্ধ সরঞ্জামও সাজিয়ে রাখে, তাহলে বোঝাই যায় পরিস্থিতি কতটা গুরুতর।
গত বছরও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র দুইটি বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছিল। তখন ‘মিডনাইট হ্যামার’ নামে একটি এককালীন অভিযান চালানো হয়, যেখানে স্টিলথ বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এবার কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পনাটি আরও বিস্তৃত ও জটিল।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এবারের পরিকল্পনায় শুধু পারমাণবিক স্থাপনা নয়, ইরানের রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তা অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। যদিও তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি।
এখানে ব্যাপারটা বোঝা জরুরি। যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থাপনায় হামলা হয়, সেটি সীমিত আকারের সংঘাত হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তা স্থাপনায় আঘাত মানে পুরো ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা। তখন প্রতিক্রিয়াও হবে অনেক বড়।
উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি থেমে নেই। সম্প্রতি ওমানে মার্কিন ও ইরানি কূটনীতিকরা বৈঠক করেছেন। মূল আলোচ্য বিষয় ছিল তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।
তবে এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাধিকবার ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন। নর্থ ক্যারোলিনায় এক সামরিক ঘাঁটিতে সেনাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, কখনো কখনো শক্ত অবস্থানই পরিস্থিতি সমাধান করে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, ইরান ইস্যুতে প্রেসিডেন্টের হাতে সব অপশন খোলা রয়েছে। অর্থাৎ কূটনীতি চললেও সামরিক বিকল্প একেবারেই টেবিলের বাইরে নয়।
অন্যদিকে ইরানও চুপ করে বসে নেই। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সতর্ক বার্তা দিয়েছে—তেহরানের ভূখণ্ডে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানা হবে।
ভাবুন তো, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কতগুলো সামরিক ঘাঁটি আছে। সেগুলোর যেকোনো একটি লক্ষ্যবস্তু হলে সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের কাছে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি কম নয়।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ইরানের পাল্টা হামলার সম্ভাবনা তারা পুরোপুরি বিবেচনায় রেখেছেন। অর্থাৎ সংঘাত শুরু হলে তা একপাক্ষিক থাকবে না—এটা প্রায় নিশ্চিত।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu। যদিও বৈঠকের বিস্তারিত প্রকাশ হয়নি, বিশ্লেষকরা মনে করছেন ইরান ইস্যুই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ইসরায়েল বরাবরই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি বলে মনে করে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাতে ইসরায়েলের কৌশলগত সমর্থন বা ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ ধরনের সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্য হলো বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র। যুদ্ধ শুরু হলে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে পারে। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
ধরুন, হঠাৎ জ্বালানির দাম বেড়ে গেল। তখন পরিবহন খরচ বাড়বে, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ পড়বে। অর্থাৎ হাজার মাইল দূরের যুদ্ধও আপনার-আমার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ ইরান সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় আঘাত হানতে পারে। এতে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধান সময়সাপেক্ষ হলেও তা তুলনামূলক নিরাপদ পথ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের অবস্থান এতটাই কঠোর যে সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না।

