রাশিয়ার ভূমিকম্পের পরেই দৈত্যাকার সুনামির আঘাত
প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলো আবারও এক অদ্ভুত বিপদের মুখোমুখি। রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরেই ২৫ ফুটেরও বেশি উঁচু রাক্ষুসে ঢেউ আছড়ে পড়েছে। বহু বছর পর এমন ভয়াবহ সুনামি সতর্কতা একসঙ্গে রাশিয়া, জাপান ও আমেরিকার উপকূলে জারি করা হয়েছে।
জাপান ও আমেরিকার পারমাণবিক স্থাপনাগুলো হুমকির মুখে
কামচাটকার উপকূলের পারমাণবিক স্থাপনার তীব্র ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সুরক্ষার জন্য সমস্ত কর্মীকে সেখান থেকে বের করে আনা হয়েছে। টোকিওতে আমেরিকার দূতাবাস খালি করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে।
আলাস্কা ও হাওয়াইতে সতর্কতা, ক্যালিফোর্নিয়া উপকূল ফাঁকা
আমেরিকার আলাস্কা, হাওয়াই, ক্যালিফোর্নিয়া ও লস এঞ্জেলস উপকূলবর্তী এলাকা থেকে মানুষের সরে যাওয়ার নির্দেশ জারি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বার্তা, ‘‘শক্ত থাকুন, নিরাপদে থাকুন।’’ সতর্কতার জন্য ভারতীয় দূতাবাস ক্যালিফোর্নিয়ার ভারতীয়দের জন্য হেল্পলাইন চালু করেছে: 415-483-6629।
৯ লক্ষ মানুষের স্থানান্তর জাপানে
সবচেয়ে বড় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে জাপানের হোক্কাইডো ও উপকূলবর্তী শহরগুলোতে। প্রশাসন জানিয়েছে, ৯ লক্ষ মানুষকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। সরকারি বার্তায় বলা হয়েছে, সুনামির প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। সমুদ্র উপকূলের মানুষদের দ্রুত সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টার ও জাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের বার্তা ও ট্রুথ সোশ্যাল পোস্ট
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘‘প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল ভূমিকম্পের ফলে বড় ঢেউ যে কোনও সময় হাওয়াইতে আছড়ে পড়তে পারে। সতর্ক থাকুন, শক্তিশালী থাকুন, নিরাপদ থাকুন।’’
সুনামির ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধারকাজ
কামচাটকা উপকূলে ইতিমধ্যেই বড় বড় জাহাজ ডুবে যাওয়ার খবর এসেছে। বহু মাছ ধরার ট্রলার নিখোঁজ। সৈকতের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে গেছে। রাশিয়া ও জাপানের উদ্ধারকারী দল রাত দিন কাজ করছে। নৌসেনা, বিমানবাহিনী, স্থলবাহিনী একযোগে দুর্গতদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বহু শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে সুনামি সতর্কতা
বিশ্বের অন্যান্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, যেমন ফিলিপাইন, পাপুয়া নিউগিনি, ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশ—সবখানেই সতর্কতা জারি হয়েছে। উপকূলবর্তী স্কুল, হাসপাতাল, প্রশাসনিক ভবনগুলো বন্ধ। বড় জাহাজগুলো সমুদ্রের গভীরে পাঠানো হয়েছে, যাতে ঢেউয়ের ধাক্কা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
সুনামির প্রভাব: অর্থনীতি ও জীবিকা বিপন্ন
কামচাটকা, হোক্কাইডো ও আলাস্কার বড় অংশের অর্থনীতি মৎস্যশিল্পের উপর নির্ভরশীল। সুনামির কারণে হাজার হাজার মৎস্যজীবীর নৌকা ও জাল ভেসে গেছে। বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। মাছ রপ্তানি থমকে গেছে। বহু মানুষ অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। শিশুদের জন্য বিশেষ মেডিকেল টিম তৈরি রাখা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভূমিকম্প ও সুনামির ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে টেকটোনিক প্লেটের আন্দোলন ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ফলে একের পর এক প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে।
উদ্ধার ও পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
জাতিসংঘ, রেডক্রস, ইউনিসেফ-সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উদ্ধারকাজে হাত মিলিয়েছে। বহু দেশ শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ ও ওষুধ পাঠাচ্ছে। সেনাবাহিনী অস্থায়ী হাসপাতাল গড়ে তুলেছে। বন্যার জল নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
ভবিষ্যতের সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
বিজ্ঞানীরা বলছেন, উপকূলবর্তী অঞ্চলে শক্তিশালী সতর্কতা ব্যবস্থা, ভূমিকম্প প্রতিরোধী অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত উদ্ধারদল থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সুনামি সিমুলেশন ড্রিল চালু করার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।


