যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা বন্ড নীতিমালা: অভিবাসন কঠোরকরণে বড় পদক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিমালাকে আরও কঠোর করতে গিয়ে এবার চালু করা হয়েছে নতুন ভিসা বন্ড কর্মসূচি, যার আওতায় নির্দিষ্ট কিছু দেশের ব্যবসায়িক ও পর্যটন ভিসাধারীদের সর্বোচ্চ ১৫,০০০ ডলার পর্যন্ত বন্ড জমা দিতে হবে। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট থেকে এই ১২ মাসের পাইলট প্রকল্প কার্যকর হতে যাচ্ছে, যা মূলত বি-১ (ব্যবসায়িক) ও বি-২ (পর্যটন) ভিসা প্রার্থীদের জন্য প্রযোজ্য হবে।
কেন এই বন্ড? কারা পড়বে এর আওতায়?
এই নতুন নিয়মের লক্ষ্য হচ্ছে, যেসব দেশের নাগরিকরা অনুমোদিত মেয়াদের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে, তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা। বন্ড দেওয়ার মাধ্যমে ভিসাধারীকে বাধ্য করা হবে যেন তিনি নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই দেশে ফিরে যান।
পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, জিম্বাবুয়ে ও মালাউই থেকে আগতরা এই বন্ড নীতির প্রাথমিক লক্ষ্য। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ১২টি দেশের নাগরিকদের ভিসা ফি ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছিল, এবার সেই নীতিকে আরও একধাপ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কোন দেশগুলো ছাড় পাবে?
মেক্সিকো, কানাডা এবং ভিসা ওয়াইভার প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত ৪০টিরও বেশি দেশের নাগরিকরা এই বন্ডের আওতামুক্ত থাকবেন। এই দেশগুলোর নাগরিকরা ৯০ দিনের জন্য ভিসা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে পারেন ব্যবসা বা পর্যটনের উদ্দেশ্যে।
ভিসা বন্ড কী এবং এর গুরুত্ব কতটুকু?
ভিসা বন্ড হলো এক ধরনের আর্থিক গ্যারান্টি, যা যুক্তরাষ্ট্র সরকার নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে ভিসা দেওয়ার সময় গ্রহণ করবে, যেন তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন।
এটি মূলত অস্থায়ী ভিসাধারীদের জন্য প্রযোজ্য যারা পর্যটক, শিক্ষার্থী অথবা শ্রমিক হিসেবে দেশটিতে প্রবেশ করেন। এই বন্ড ফেরতযোগ্য হবে যদি ভিসার সব শর্ত ঠিকভাবে মানা হয়।
কত টাকার বন্ড জমা দিতে হবে?
এই পাইলট কর্মসূচিতে তিনটি স্তরের বন্ড নির্ধারণ করা হয়েছে —
- ৫,০০০ ডলার
- ১০,০০০ ডলার
- ১৫,০০০ ডলার
এই পরিমাণ নির্ধারণ করবেন কনসুলার অফিসাররা। তারা আবেদনকারীর ভ্রমণের উদ্দেশ্য, আয়, চাকরি, শিক্ষা ও অন্যান্য আর্থ-সামাজিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন।
কারা ছাড় পেতে পারেন?
বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে যেমন মানবিক কারণ, জরুরি চিকিৎসা বা মার্কিন সরকারি কর্মচারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের প্রেক্ষাপটে বন্ড মওকুফের সুযোগ থাকতে পারে।
ইতিহাস বলছে কী?
ট্রাম্প প্রশাসন ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো ভিসা বন্ড প্রোগ্রাম চালু করেছিল, কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তখনকার দিনে কনসুলার অফিসারদের এই ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
তবে সময়ের সাথে বাস্তবতা বদলেছে। এখন, যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত মেয়াদ পেরিয়ে অবস্থানরতদের সংখ্যা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব অভিবাসন ব্যবস্থায় স্পষ্ট।
কোন দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে?
নতুন নিয়মে প্রথম পর্যায়ে মালাউই ও জাম্বিয়া-র নাগরিকদের ভিসার বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৫,০০০ ডলার বন্ড দিতে হতে পারে।
ভবিষ্যতে তালিকায় আরও যুক্ত হতে পারে এমন কিছু দেশ, যেগুলো—
- উচ্চ ওভারস্টে হার রয়েছে
- নিরাপত্তা যাচাইয়ে দুর্বলতা আছে
- বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব দেওয়ার সুযোগ রাখে
এই ক্যাটাগরিতে পড়ে যেমন—
অ্যান্টিগা ও বারবুডা, অস্ট্রিয়া, জর্ডান, সেন্ট লুসিয়া ও তুরস্ক।
ওভারস্টে হার: কোন দেশ এগিয়ে?
যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশসহ হাইতি, লাওস, মায়ানমার ও ইয়েমেন— এই দেশগুলো থেকে আগত ভিসাধারীদের ওভারস্টে হার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে ওভারস্টের ভূমিকা কতটা?
জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের (DHS) তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ৩৯ মিলিয়নের বেশি ভিসাধারীর দেশ ছাড়ার কথা থাকলেও, তার মধ্যে প্রায় ৪ লক্ষ জন অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করেছেন।
একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের প্রায় ৪০%-ই মূলত ভিসা মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করা ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত।
চ্যালেঞ্জ ও কূটনৈতিক প্রভাব
ভিসা বন্ড নীতি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, কিন্তু একইসাথে এটি কূটনৈতিক জটিলতাও তৈরি করতে পারে। যেসব দেশের নাগরিকরা এই বন্ডের আওতায় পড়বেন, তাদের ভিসা প্রক্রিয়া আরও জটিল হবে এবং এতে পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


