পশ্চিম এশিয়ায় সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে নজিরবিহীন বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ইজ়রায়েল-আমেরিকার যৌথ বিমান হামলা এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের ফলে পুরো অঞ্চলের আকাশপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, বাহরিন, কাতার ও জর্ডন তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিষেবায়—বাতিল হয় ৬,০০০-এরও বেশি উড়ান।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পশ্চিম এশিয়ার প্রধান ট্রানজিট হাবগুলি—দুবাই, দোহা ও আবুধাবি বিমানবন্দর। লক্ষাধিক যাত্রী বিমানবন্দর ও হোটেলে আটকে পড়েছেন। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত ঘোষণা মেলেনি।
২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সামরিক সংঘর্ষ তীব্র আকার নিতেই একে একে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের জন্য এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের প্রধান করিডর হিসেবেই এটি ব্যবহৃত হয়।
আকাশপথ বন্ধ হওয়ায় বহু আন্তর্জাতিক বিমানসংস্থা অনির্দিষ্টকালের জন্য অঞ্চলটির ভিতর দিয়ে ও উপর দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে। এতে শুধু সরাসরি পশ্চিম এশিয়া গামী নয়, ট্রানজিট ফ্লাইটগুলিও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটগুলির তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ার প্রধান বিমান সংস্থাগুলিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এমিরেটস বাতিল করেছে প্রায় ৪৮৫টি ফ্লাইট
ইতিহাদ এয়ারওয়েজ় বাতিল করেছে ১৯০টি ফ্লাইট
ফ্লাই দুবাই বাতিল করেছে ১৮১টি ফ্লাইট
কাতার এয়ারওয়েজ় বাতিল করেছে ১০৬টি ফ্লাইট
এই বিপুল সংখ্যক ফ্লাইট বাতিল আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যবস্থায় এক বিরাট অচলাবস্থা তৈরি করেছে।
পশ্চিম এশিয়ার বাইরেও প্রভাব পড়েছে অন্যান্য দেশের বিমান সংস্থাগুলিতে। ভারতের স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা ইন্ডিগো ইতিমধ্যে ১২৯টি ফ্লাইট বাতিল করেছে, যা পশ্চিম এশিয়ার বাইরের বিমান সংস্থাগুলির মধ্যে সর্বাধিক। এর পরে রয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া, যারা ২৮টি ফ্লাইট বাতিল করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সর্বাধিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। সোমবার দুপুর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী—
৪৩৫টি উড়ান বাতিল
৩৯৫টি অবতরণ বাতিল
দুবাই বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর। এখানকার ফ্লাইট বাতিল মানেই গোটা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যাত্রী পরিষেবায় প্রভাব পড়া। ট্রানজিট যাত্রীদের অনেকেই বিমানবন্দরেই দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছেন।
দুবাই কর্তৃপক্ষ হোটেলগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে, যাতে ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়। সরকার নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
শুধু দুবাই নয়, আবুধাবি বিমানবন্দরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
১২১টি উড়ান বাতিল
১২৩টি অবতরণ বাতিল
দোহা বিমানবন্দরও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ কাতার এয়ারওয়েজ়ের বড় অংশের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট এখানেই পরিচালিত হয়। ফলে ইউরোপ-এশিয়া রুটে যাতায়াতকারী হাজার হাজার যাত্রী আটকে পড়েছেন।
এই বিমানবন্দরগুলির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্পেও বড়সড় প্রভাব পড়েছে।
লক্ষাধিক যাত্রী বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন বিমানবন্দর ও হোটেলে আটকে আছেন। অনেকের কানেক্টিং ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তাঁরা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ফ্লাইট পুনরায় কবে চালু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না থাকায় যাত্রীদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে। কিছু সীমিত ফ্লাইট চালু থাকলেও তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
ভ্রমণ বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশপথ পুরোপুরি খুলে না দেওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সূচি স্বাভাবিক করা কঠিন হবে।
পশ্চিম এশিয়ায় আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ভারত সরকারের অসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রক বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে।
প্যাসেঞ্জার অ্যাসিস্ট্যান্স কন্ট্রোল রুম (পিএসিআর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ‘এয়ারসেবা পোর্টাল’ এবং নির্ধারিত হেল্পলাইনের মাধ্যমে যাত্রীদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।
ভারতীয় যাত্রী ও তাঁদের পরিজনদের নিম্নলিখিত হেল্পলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে:
০১১-২৪৬০৪২৮৩ / ০১১-২৪৬৩২৯৮৭
মন্ত্রক জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়া হয়ে সম্ভাব্য বিকল্প ফ্লাইট এবং উদ্ধার সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত জানানো হবে।
পশ্চিম এশিয়া আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের কেন্দ্রবিন্দু। এখানকার অস্থিরতা কেবল সাময়িক ফ্লাইট বাতিলেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয়, বিমানের রুট পরিবর্তন, টিকিটের দাম বৃদ্ধি এবং যাত্রী পরিষেবায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
বহু বিমান সংস্থা ইতিমধ্যে বিকল্প রুট ব্যবহার শুরু করেছে, যার ফলে উড়ানের সময় বেড়েছে এবং পরিচালন খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিমান ভাড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ শিল্প বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে গভীর সংকট তৈরি করেছে। ৬,০০০-এর বেশি ফ্লাইট বাতিল এবং দুবাই, আবুধাবি ও দোহা বিমানবন্দরের ব্যাপক ক্ষতি প্রমাণ করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা।
যাত্রীদের নিরাপত্তা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তবে আকাশসীমা পুরোপুরি খুলে না দেওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক বিমান পরিষেবা ফিরে আসা কঠিন।
বিশ্বজুড়ে যাত্রী, বিমান সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এখন একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—এই অচলাবস্থা কবে কাটবে?
পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেই ধীরে ধীরে ফ্লাইট পরিষেবা স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ততদিন পর্যন্ত যাত্রীদের ধৈর্য ধরেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।


