রাগ তো আমাদের সবারই হয়। অফিসে বস কিছু বললেন, বাসায় ছোট্ট একটা বিষয় নিয়ে তর্ক বাঁধল, রাস্তায় কেউ ধাক্কা দিল—মুহূর্তেই মাথা গরম হয়ে যায়। তখন মনে হয়, দু’কথা শুনিয়ে দিলে বুক হালকা হবে। সত্যি বলতে কী, ওই মুহূর্তে একটু ভালোও লাগে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে কী ক্ষতি হচ্ছে, সেটা আমরা বুঝতেই পারি না।
সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মাত্র টানা ৮ মিনিটের তীব্র রাগই হৃদ্যন্ত্রের জন্য ভয়ংকর হতে পারে। এই অল্প সময়েই শরীরের ভেতরে এমন সব পরিবর্তন শুরু হয়, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
আমরা সাধারণত ভাবি রাগ মানে শুধু মানসিক ব্যাপার। কিন্তু আসলে রাগ পুরো শরীরকে নাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্রকে।
গবেষকদের মতে, কেউ যদি একটানা কয়েক মিনিট ধরে প্রচণ্ড রেগে থাকেন, দাঁত কিড়মিড় করেন, চিৎকার করেন বা আক্রমণাত্মক আচরণ করেন—তাহলে তার শরীরে হঠাৎ হরমোনের ঝড় শুরু হয়। এই ঝড়ের ধাক্কা সবার আগে লাগে হার্টে।
আমাদের মস্তিষ্কে একটি অংশ আছে, যার নাম অ্যামিগডালা। রেগে গেলে এই অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেখান থেকে সংকেত যায় হাইপোথ্যালামাসে, তারপর পিটুইটারি গ্রন্থিতে। পুরো প্রক্রিয়াটা খুব দ্রুত ঘটে।
এই সময় শরীরে অ্যাড্রিনালিন আর কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন দ্রুত বেড়ে যায়। অ্যাড্রিনালিন বাড়লে কী হয় জানেন? হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে যায়। হার্ট দ্রুত ধুকপুক করতে থাকে। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে যায়। মনে হয় বুকের ভেতর চাপ লাগছে।
এভাবে যদি টানা ৮ মিনিট তীব্র রাগ থাকে, তাহলে রক্তনালিতে চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি রক্তজালিকার ক্ষতিও হতে পারে। এই অবস্থায় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
American Heart Association–এর গবেষকেরা প্রায় ২৮০ জন মানুষের উপর একটি সমীক্ষা চালান। তারা লক্ষ্য করেন, অংশগ্রহণকারীরা যখন প্রচণ্ড রাগ প্রকাশ করেন এবং সেই অবস্থা কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়, তখন অনেকেই বুকে চাপধরা ব্যথা অনুভব করেন।
শারীরিক পরীক্ষায় দেখা যায়, তীব্র রাগের সময় রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে যায় এবং হৃদ্স্পন্দন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এই অনিয়ম দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক হতে পারে।
আমাদের রক্তনালির ভেতরে একটি আস্তরণ থাকে, যার নাম এন্ডোথেলিয়াম। এটা রক্তপ্রবাহ ঠিক রাখে এবং রক্ত যেন জমাট না বাঁধে, তা নিয়ন্ত্রণ করে।
কিন্তু আপনি যদি রাগের মাথায় চিৎকার-চেঁচামেচি করেন, শরীর টানটান করে ফেলেন, তখন রক্তনালির উপর চাপ পড়ে। এই এন্ডোথেলিয়াম স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ধমনীর ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ে। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় বড় বিপদ।
সহজভাবে বললে, বারবার তীব্র রাগ করলে আপনার হার্টের রাস্তা ধীরে ধীরে সরু হয়ে যেতে পারে।
রাগের প্রভাব শুধু হৃদ্যন্ত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন ধরে বেশি রাগ করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। থাইরয়েড গ্রন্থির কাজেও প্রভাব পড়ে। ঘুমের সমস্যা শুরু হয়। মাথাব্যথা, গ্যাস্ট্রিক, উচ্চ রক্তচাপ—সবই বাড়তে থাকে।
অনেক সময় আমরা বলি, “আমি তো একটু রাগী, কিন্তু তাতে কী?” সমস্যা হচ্ছে, এই “একটু” যদি নিয়মিত হয়, তাহলে সেটা শরীরের জন্য নীরব বিষের মতো কাজ করে।
এখনকার জীবনটা আগের চেয়ে অনেক বেশি চাপের। অফিসের টার্গেট, সংসারের দায়িত্ব, অর্থনৈতিক চিন্তা—সব মিলিয়ে মাথার ভেতর যেন সারাক্ষণ চাপ জমে থাকে। ছোট্ট একটা ঘটনাই তখন বিস্ফোরণের মতো কাজ করে।
আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন, আগে যে বিষয়টা নিয়ে হাসতাম, এখন সেটাই নিয়ে চটে যাই। কারণ ভেতরে ভেতরে আমরা ক্লান্ত আর মানসিকভাবে চাপে আছি।
রাগকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব নয়। মানুষ বলে কথা, রাগ হবেই। কিন্তু সেটাকে কীভাবে সামলাবেন, সেটাই আসল।
রাগ উঠতে শুরু করলে প্রথমেই একটু থামুন। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দিয়ে ১০ সেকেন্ড চুপ থাকুন। গভীর শ্বাস নিন। দেখবেন, শরীরের ভেতরের ঝড়টা একটু কমছে।
হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। এক গ্লাস পানি খেতে পারেন। সম্ভব হলে সেই জায়গা থেকে কিছু সময়ের জন্য সরে যান। এই ছোট্ট বিরতিটাই আপনার হার্টকে বাঁচাতে পারে।
আর যদি মনে হয় আপনি খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়াও ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। এতে লজ্জার কিছু নেই।
হার্ট অ্যাটাক কখনও হুট করে হয় না। অনেক সময় বছরের পর বছর ধরে ছোট ছোট ক্ষতির ফল একদিন বড় বিপদ হয়ে সামনে আসে। আপনি যদি নিয়মিত রেগে যান, চিৎকার করেন, ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ পুষে রাখেন—তাহলে আপনার হৃদ্যন্ত্র চুপচাপ সেই চাপ সহ্য করে যাচ্ছে।
কিন্তু একদিন হয়তো সেই সহ্যশক্তি ফুরিয়ে যাবে।
ভাবুন তো, সামান্য কিছু মুহূর্তের উত্তেজনার জন্য যদি নিজের হার্টকে ঝুঁকিতে ফেলি, সেটা কি ঠিক? রাগের সময় মনে হয় আমরা জিতেছি। কিন্তু শরীরের ভেতরে আমরা তখন হেরে যাচ্ছি।
রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত রাগ বিপজ্জনক। মাত্র ৮ মিনিটের তীব্র ক্রোধই হৃদ্যন্ত্রের উপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে—এ কথা এখন গবেষণায় প্রমাণিত।
তাই নিজেকে একটু সময় দিন। নিজের মনকে বোঝার চেষ্টা করুন। রাগ উঠলে থামুন, শ্বাস নিন, ভাবুন। কারণ আপনার হার্ট কিন্তু খুব নীরবে আপনার জন্যই কাজ করে যাচ্ছে, প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।
ওকে অযথা আঘাত দেবেন না।



