ভারতে চিকিৎসার জগতে চুপচাপ একটা বদল ঘটছে। যে গাছটাকে এতদিন শুধু নেশার সঙ্গে জড়িয়ে দেখা হত, সেই গাঁজা এখন চিকিৎসার বিকল্প পথ হিসেবে সামনে আসছে। মেডিক্যাল ক্যানাবিস বা মেডিক্যাল মারিজুয়ানা এখন দীর্ঘদিনের ব্যথা, অনিদ্রা, উদ্বেগ এমনকি ক্যানসারের চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বিষয়টা একসময় বিতর্কিত ছিল, কিন্তু এখন ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে নিয়ন্ত্রিতভাবে এর ব্যবহার বাড়ছে।
মেডিক্যাল ক্যানাবিস হল গাঁজা গাছ থেকে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি ওষুধ। এই উপাদানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত দুটি হল ক্যানাবিডিওল (CBD) এবং টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (THC)।
CBD মূলত নেশাহীন উপাদান। এটি শরীরের ব্যথা, উদ্বেগ, প্রদাহ এবং ঘুমের সমস্যায় সাহায্য করে। অন্যদিকে THC সীমিত মাত্রায় ব্যবহৃত হয় এবং এটি ব্যথা উপশম ও ক্ষুধা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তবে THC ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সহজভাবে বললে, আমাদের শরীরে একটি বিশেষ সিস্টেম আছে যাকে এন্ডোক্যানাবিনয়েড সিস্টেম বলা হয়। এটি ব্যথা, মুড, ঘুম এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। মেডিক্যাল ক্যানাবিস এই সিস্টেমের উপর কাজ করে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।
ভারতে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা এখন বড় সমস্যা। অনেক মানুষ বছরের পর বছর পিঠের ব্যথা, স্নায়ুর ব্যথা বা আর্থ্রাইটিসে ভোগেন। নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে। এই জায়গায় ক্যানাবিস-ভিত্তিক ওষুধ বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে।
অনিদ্রাও কম কষ্টের নয়। সারারাত এপাশ-ওপাশ করে কাটানো, সকালে ক্লান্ত লাগা—এটা অনেকের পরিচিত অভিজ্ঞতা। কিছু ক্ষেত্রে মেডিক্যাল ক্যানাবিস ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করছে। বিশেষ করে যারা মানসিক চাপ বা উদ্বেগের কারণে ঘুমোতে পারেন না, তাদের জন্য এটি কার্যকর হতে পারে।
ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালীন রোগীরা প্রায়ই বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা এবং মানসিক অবসাদে ভোগেন। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে মেডিক্যাল ক্যানাবিস কিছু রোগীর ক্ষেত্রে উপশম এনে দিচ্ছে।
ক্ষুধা বাড়ানো এবং বমি কমানোর ক্ষেত্রে THC-সমৃদ্ধ ওষুধ সীমিত মাত্রায় ব্যবহার করা হয়। অবশ্যই এটি চিকিৎসকের কড়া তত্ত্বাবধানে প্রয়োগ করতে হয়।
ভারতে ক্যানাবিস সম্পূর্ণ অবাধ নয়। নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস অ্যাক্ট অনুযায়ী গাঁজার ফুল ও রজন নিষিদ্ধ। তবে বীজ ও পাতা নির্দিষ্ট শর্তে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিক্স অ্যাক্ট অনুযায়ী ক্যানাবিস-ভিত্তিক ওষুধ কিনতে হলে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ এটি কোনোভাবেই নিজে থেকে কিনে ব্যবহার করার বিষয় নয়। সবকিছুই আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে করতে হয়।
আসলে গাঁজা গাছের ব্যবহার ভারতে নতুন কিছু নয়। আয়ুর্বেদে বহু শতাব্দী ধরে নির্দিষ্ট প্রয়োজনে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। পার্থক্য হল, আগে ছিল ঐতিহ্যনির্ভর প্রয়োগ, এখন যুক্ত হয়েছে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নিয়ন্ত্রিত ডোজ।
এই দুই ধারার মেলবন্ধনই বর্তমানে মেডিক্যাল ক্যানাবিসকে নতুনভাবে পরিচিত করে তুলছে। গবেষকরা নিরাপদ মাত্রা, সঠিক প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন।
গত এক থেকে দেড় বছরে ভারতে ক্যানাবিস-ভিত্তিক চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, উদ্ভিদভিত্তিক চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা—সব মিলিয়ে এই ক্ষেত্র এগোচ্ছে।
একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাও এখানে উল্লেখ করা যায়। এক পরিবারের সদস্যের ক্যানসার চিকিৎসার সময় অনিদ্রা ও ক্ষুধামন্দা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশে চিকিৎসকের পরামর্শে মেডিক্যাল ক্যানাবিসের কথা জানা গেলেও দেশে সহজলভ্য ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশে ক্যানাবিস-ভিত্তিক ওষুধ তৈরির উদ্যোগ শুরু হয়।
এই ধরনের উদ্যোগই দেখাচ্ছে যে, প্রয়োজন থেকেই নতুন পথের জন্ম হয়।
মেডিক্যাল ক্যানাবিস তেল ও টিঙ্কচারের দাম তুলনামূলক বেশি। কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। কারণ কাঁচামাল সংগ্রহ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নির্যাস তৈরির প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল।
তবে চাহিদা বাড়লে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও উন্নত হলে ভবিষ্যতে দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার—মেডিক্যাল ক্যানাবিস মানেই সাধারণ গাঁজা সেবন নয়। এটি নির্দিষ্ট মাত্রায়, নির্দিষ্ট রোগের জন্য, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করতে হয়।
নিজে থেকে পরীক্ষা করার মতো বিষয় এটি নয়। কারণ ভুল মাত্রা বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা থাকলে আরও সতর্ক হতে হয়।
ভারতে মেডিক্যাল ক্যানাবিস এখনও বিকাশের পথে। গবেষণা চলছে, নীতিনির্ধারণী স্তরে আলোচনা হচ্ছে, এবং রোগীদের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ধীরে হলেও এটি চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে জায়গা তৈরি করছে।
সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ এখন খোলামেলা ভাবে এই বিষয়ে কথা বলছে। আগে যেখানে শুধুই সামাজিক দ্বিধা ছিল, এখন সেখানে তথ্যভিত্তিক আলোচনা হচ্ছে।
চিকিৎসা মানে শুধু ওষুধ নয়, রোগীর স্বস্তি ও জীবনমান উন্নত করা। যদি নিয়ন্ত্রিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মেডিক্যাল ক্যানাবিস সেই কাজে সাহায্য করতে পারে, তাহলে এটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শেষ কথা একটাই—মেডিক্যাল ক্যানাবিস কোনো জাদু সমাধান নয়। তবে এটি অনেকের জীবনে ব্যথা, অনিদ্রা ও মানসিক চাপে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারছে। সতর্কতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সঠিক আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে এই পথ এগোলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।



