একসময় মানুষ ভাবত, শীত এলেই সর্দি-কাশি আর জ্বরের মতো সমস্যার সঙ্গে ইনফ্লুয়েঞ্জা দেখা দেয়। কিন্তু এখন সেই ধারণা বদলে গেছে। সারা বছরই এই ভাইরাসের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। এ কারণেই World Health Organization বা হু নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা এখন আর সাধারণ মৌসুমি অসুখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভাইরাসটি দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ধরন। ফলে আগের চেয়ে এটি অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই বিশ্বজুড়ে মানুষকে টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে হু।
চলুন সহজভাবে বুঝে নেওয়া যাক— কেন ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে এত সতর্কতা এবং কারা দ্রুত টিকা নেবেন।
ইনফ্লুয়েঞ্জা আসলে এক ধরনের ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। এটি সাধারণত নাক, গলা ও ফুসফুসে আক্রমণ করে। অনেক সময় মানুষ এটিকে সাধারণ সর্দি-জ্বর ভেবে হালকা করে নেয়। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক বেশি গুরুতর হতে পারে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য এই ভাইরাস মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রধান ধরন দুটি—
Influenza A virus এবং Influenza B virus।
তবে বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, এই ভাইরাসের আরও কিছু নতুন উপধরন বা সাবক্লেড তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে একটি “সাবক্ল্যান্ড কে” ধরনের ভাইরাস নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
বিজ্ঞানীরা কয়েকটি বড় কারণ দেখিয়ে বলছেন, ভবিষ্যতে ইনফ্লুয়েঞ্জা আবার বড় স্বাস্থ্য সঙ্কট তৈরি করতে পারে।
প্রথম কারণ হলো—এই ভাইরাস খুব দ্রুত মিউটেশন করে। সহজ ভাষায় বললে, এটি খুব দ্রুত নিজের গঠন বদলে ফেলতে পারে। ফলে পুরোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনেক সময় নতুন ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না।
দ্বিতীয় কারণ হলো—পশুপাখি থেকে মানুষের শরীরে ভাইরাস সহজেই ছড়াতে পারে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ Avian influenza বা বার্ড ফ্লু। এটি আসলে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসেরই একটি রূপ।
তৃতীয় কারণটি আরও চিন্তার। অনেকেই ভাবেন ইনফ্লুয়েঞ্জা মানে শুধু জ্বর আর সর্দি। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে।
যেমন—
নিউমোনিয়া
হৃদ্রোগের সমস্যা
শ্বাসকষ্ট
কিছু ক্ষেত্রে একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়া
এই কারণেই বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জাকে হালকা অসুখ হিসেবে দেখা এখন আর নিরাপদ নয়।
হু জানিয়েছে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই তাদের দ্রুত টিকা নেওয়া উচিত।
প্রথমত, যাদের ফুসফুসের দীর্ঘদিনের রোগ রয়েছে। যেমন Chronic obstructive pulmonary disease বা সিওপিডি, হাঁপানি বা অন্য ফুসফুসজনিত সমস্যা থাকলে টিকা নেওয়া খুব জরুরি।
দ্বিতীয়ত, ছোট শিশু ও বয়স্ক মানুষ। কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকে।
হু-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী—
৬ মাস বয়সের শিশু থেকে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ পর্যন্ত সবাই ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিতে পারেন।
এটি শরীরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে আগে থেকেই প্রস্তুত করে দেয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে ডোজের নিয়ম একটু আলাদা।
৬ মাস থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুদের দুইটি ডোজ নিতে হয়। প্রথম ডোজ নেওয়ার চার সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে।
এরপর প্রতি বছর একটি করে বুস্টার ডোজ নিলেই যথেষ্ট।
৯ বছর বা তার বেশি বয়স হলে বছরে একবার টিকা নিলেই চলে।
বর্তমানে বাজারে যে ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকাগুলি পাওয়া যায়, সেগুলোর ডোজ সাধারণত ০.৫ মিলিলিটার।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক জায়গায় কয়েকটি পরিচিত ব্র্যান্ডের টিকা পাওয়া যায়। সাধারণত এক ডোজ টিকার দাম প্রায় ১৫০০ থেকে ২২০০ টাকার মধ্যে হতে পারে।
তবে হাসপাতাল বা শহরভেদে দাম কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস খুব দ্রুত রূপ বদলায়। তাই এই টিকা একবার নিলেই সারাজীবন সুরক্ষা পাওয়া যায় না।
প্রতি বছর টিকা নেওয়া দরকার।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত দুইটি সময়কে টিকা নেওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো মনে করেন।
প্রথম সময়টি হলো বর্ষার আগে—এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে।
দ্বিতীয় সময়টি হলো শীত আসার আগে—সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে।
এই সময় টিকা নিলে শরীর আগেভাগেই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে।
টিকা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে যাদের খাবারে অ্যালার্জি আছে বা দীর্ঘদিনের কোনও অসুখের ওষুধ চলছে, তাদের আগে ডাক্তারকে জানানো উচিত।
গর্ভবতী নারী, হৃদ্রোগী বা ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ডাক্তার রোগীর অবস্থা দেখে ঠিক করবেন টিকা নেওয়া নিরাপদ কি না।
টিকা নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা। তবে কিছু সাধারণ অভ্যাসও ভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে।
যেমন নিয়মিত হাত ধোয়া
কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা
অসুস্থ ব্যক্তির কাছাকাছি না যাওয়া
শরীর খারাপ হলে বিশ্রাম নেওয়া
এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো অনেক সময় বড় সংক্রমণ ঠেকাতে সাহায্য করে।
অনেকেই এখনও ইনফ্লুয়েঞ্জাকে সাধারণ জ্বর বলে ভাবেন। কিন্তু বাস্তবে এই ভাইরাস অনেক সময় গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভাইরাসের দ্রুত মিউটেশন, পশুপাখি থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং গুরুতর জটিলতা তৈরি করার ক্ষমতা—এই তিন কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন বিশেষভাবে সতর্ক করছে।
তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকা নেওয়া এবং সচেতন থাকা—এই দুটিই ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।



