ডায়াবেটিস আক্রান্তদের জন্য খাবার বাছাই করা যেন এক ভারসাম্যের খেলা। প্রতিটি খাবার রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব ফেলে, আর তাই সঠিক খাদ্যাভ্যাসই এই রোগ নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। এমন এক ফল পেয়ারা, যা স্বাদে মিষ্টি হলেও ডায়াবেটিকদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পছন্দ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—কাঁচা পেয়ারা ভালো, না পাকা? আর পেয়ারাপাতার জল কি রক্তে সুগার কমাতে আরও কার্যকর?
পেয়ারা: ফাইবার সমৃদ্ধ একটি প্রাকৃতিক চিকিৎসা
পেয়ারা এমন একটি ফল, যা ফাইবারে সমৃদ্ধ, ক্যালোরি কম এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্সও (GI) তুলনামূলকভাবে নিচু। ১০০ গ্রাম পেয়ারায় ক্যালোরি মাত্র ৬৮, কিন্তু তাতে রয়েছে ৫.৪ গ্রাম ডায়েটারি ফাইবার, যা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়তে দেয় না। এছাড়াও এতে ভিটামিন C, ভিটামিন A, ফোলেট, পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়ামও রয়েছে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
কাঁচা না পাকা—কোনটি ডায়াবেটিসের জন্য বেশি উপকারী?
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য প্রশ্ন আসে—ডাঁসা পেয়ারা খাবেন, না পুরোপুরি পাকা পেয়ারা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাঁসা পেয়ারা খান অনেক বেশি উপকারে আসবে, কারণ এতে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে এবং ফাইবার বেশি। পাকা পেয়ারায় মিষ্টত্ব ও রস বেশি থাকায় তার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সামান্য বাড়ে, যা অতিরিক্ত খেলে রক্তে সুগার বাড়াতে পারে।
ডায়াবেটিস চিকিৎসক ডাঃ অভিজ্ঞান মাঝি বলেন, “ফাইবারযুক্ত খাবারগুলো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম রাখে। পেয়ারা সেই তালিকায় পড়ে। তবে খুব বেশি পাকা না খাওয়াই ভালো।”
চাট বানিয়ে খাওয়া: কি ডায়াবেটিকদের জন্য নিরাপদ?
অনেকে পেয়ারা লবণ, মরিচ, সর্ষে দিয়ে মশলাদার চাট হিসেবে খেয়ে থাকেন। এতে ক্ষতি হয় কি না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যতক্ষণ না অতিরিক্ত নুন, চিনি বা তেল যোগ করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত পেয়ারা চাটও ডায়াবেটিকদের জন্য ক্ষতিকর নয়। দিল্লির চিকিৎসক ডাঃ নরেন্দ্র সিংহের মতে, “মাঝেমধ্যে সামান্য স্বাদবর্ধনের জন্য চাট খাওয়া সমস্যা নয়, তবে তেল বা মিষ্টি উপাদান যোগ না করাই ভালো।”
পেয়ারাপাতার জল: গুজব না বাস্তব?
সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পেয়ারাপাতার জল ডায়াবেটিস কমাতে কার্যকর বলে নানা টোটকার প্রচার রয়েছে। কিন্তু আদৌ কি এতে উপকার হয়?
ডাঃ অভিজ্ঞান মাঝির ভাষায়, “পেয়ারাপাতায় রয়েছে কিছু ভেষজ গুণ, যেগুলি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে এখনও পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি, তাই একে একমাত্র সমাধান হিসেবে ধরা যায় না। তবুও, এটি ক্ষতিকর নয়, তাই ইচ্ছা থাকলে খাওয়া যেতে পারে।”
অন্যদিকে ডাঃ নরেন্দ্র সিংহ বলেন, “পেয়ারাপাতা অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ, যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। বিশেষত, এটি অন্ত্র থেকে শর্করা শোষণে প্রভাব ফেলে এবং ইনসুলিন প্রতিক্রিয়া উন্নত করে।”
খোসাসহ না খোসা ছাড়া? কোনভাবে খাবেন পেয়ারা?
২০১৬ সালে PubMed-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, খোসা ছাড়া পেয়ারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আরও বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ, খোসায় থাকা কিছু উপাদান রক্তে শর্করার মাত্রায় হালকা পরিবর্তন আনতে পারে। তবে খোসাসহ খাওয়াতেও ক্ষতি নেই, যদি পরিমিত খাওয়া হয় এবং পরিষ্কারভাবে ধুয়ে নেওয়া হয়।
পরিমিতি—উপকারের মূল চাবিকাঠি
পেয়ারা হোক বা পেয়ারাপাতা—সবকিছুই তখনই উপকারী হয়, যখন তা সঠিক মাত্রায় গ্রহণ করা হয়। পুষ্টিবিদরা বলছেন, প্রতিদিন এক বা দুইটি মাঝারি আকৃতির পেয়ারা ডায়াবেটিকদের জন্য নিরাপদ ও উপকারী। বেশি খেলে বিপরীত প্রভাবও ফেলতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য পেয়ারা খাওয়ার নিয়ম:
- ডাঁসা বা অল্প পাকা পেয়ারা খেতে চেষ্টা করুন
- খোসা ছাড়িয়ে খেলে উপকারিতা বাড়তে পারে
- মশলাদার চাট বানালে অতিরিক্ত নুন, তেল, চিনি ব্যবহার করবেন না
- পেয়ারাপাতার জল খেতে পারেন, তবে নিয়মিত ও পরিমিতভাবে
- সঠিক খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি শরীরচর্চা ও ওষুধ চালিয়ে যেতে ভুলবেন না
উপসংহার:
ডায়াবেটিস আক্রান্তদের জন্য পেয়ারা একটি নিরাপদ ও উপকারী ফল। তবে সব সময় পরিমিত খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাই হলো সবচেয়ে বড় সতর্কতা। কাঁচা পেয়ারা খান, প্রয়োজনে খোসা ছাড়িয়ে নিন, আর নিয়ম মেনে পেয়ারাপাতার জল পান করুন—তবেই মিলবে প্রকৃত উপকার।
স্মরণ রাখুন—প্রাকৃতিক পথেও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ সর্বদা অগ্রাধিকার পেতেই হবে।


