শীত এলেই আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে অনেক পরিবর্তন আসে। ঠান্ডা পড়লে অনেকেই মনে করেন ডাবের জল বুঝি শুধু গরমের জন্য। ফলে শীতকাল শুরু হতেই ডাবের জল ধীরে ধীরে ডায়েট থেকে বাদ পড়ে যায়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, এই ধারণা একেবারেই ভুল। শীতের দিনেও ডাবের জল শরীরের জন্য সমানভাবে উপকারী, বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রয়োজনীয়।
আমরা যেমন শীতে জল কম খেয়ে ফেলি, তেমনই শরীরের ভেতরের আর্দ্রতাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তখন ডাবের জল হতে পারে সহজ, প্রাকৃতিক আর স্বাস্থ্যকর সমাধান। চলুন, সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যাক—শীতে ডাবের জল খাওয়ার আসল উপকারিতা কী, কীভাবে খাবেন, আর কারা সাবধান থাকবেন।
শীতকালে শরীর আর্দ্র রাখার সহজ উপায় ডাবের জল
শীতে তেষ্টা কম পায়, তাই অজান্তেই জল খাওয়ার পরিমাণ কমে যায়। এর ফলেই ঠোঁট ফাটে, ত্বক রুক্ষ হয়ে ওঠে, শরীর ক্লান্ত লাগে। ডাবের জল নিয়মিত খেলে এই সমস্যাগুলো অনেকটাই কমে।
ডাবের জলে প্রাকৃতিকভাবে থাকা জল শরীরকে ভেতর থেকে আর্দ্র রাখে। শুধু তাই নয়, এটি ত্বককে করে তোলে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। শীতে যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ত্বককে একটু নিষ্প্রভ মনে হয়, তখন এক গ্লাস ডাবের জলই হতে পারে ছোট কিন্তু কার্যকর অভ্যাস।
শীতেও পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে ডাবের জল
অনেকেই ভাবেন, শীতকালে শরীরের পুষ্টির চাহিদা কমে যায়। আসলে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। ঠান্ডায় শরীরকে উষ্ণ রাখতে ও শক্তি ধরে রাখতে পুষ্টির প্রয়োজন আরও বাড়ে।
ডাবের জলে থাকা পটাশিয়াম, সোডিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে শরীর চাঙ্গা থাকে, দুর্বলতা কমে এবং সারাদিন কাজ করার শক্তি পাওয়া যায়। যারা শীতে অলসতা বা ঝিমুনির সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের জন্য ডাবের জল দারুণ সহায়ক।
হজমের সমস্যা কমাতে শীতেও ভরসা ডাবের জল
শীত মানেই উৎসব, নিমন্ত্রণ, পিকনিক আর জমিয়ে খাওয়াদাওয়া। পোলাও, মাংস, মিষ্টি—সব মিলিয়ে হজমের উপর চাপ পড়ে। এর ফলেই গ্যাস, অম্বল বা পেট ভারী লাগার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
ডাবের জল হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এটি পেট ঠান্ডা রাখে এবং অন্ত্রের কাজ সহজ করে। ভারী খাবারের পর এক গ্লাস ডাবের জল অনেক সময় ওষুধের থেকেও বেশি কাজ দেয়—একেবারে ঘরোয়া উপায়ে।
শীতে ডাবের জল খাওয়ার সঠিক নিয়ম
শীতকালে ডাবের জল খেলেও কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। না হলে উপকারের বদলে সমস্যা হতে পারে।
সবচেয়ে ভালো হয় ডাবের জল ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় খেলে। ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা ডাবের জল শীতে একেবারেই এড়িয়ে চলুন। সকালে জলখাবার আর দুপুরের খাবারের মাঝামাঝি সময় ডাবের জল খাওয়ার আদর্শ সময়।
রাতে ডাবের জল না খাওয়াই ভালো। এতে ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি বাড়ে। যাঁদের সহজে ঠান্ডা লাগে, তাঁরা ডাবের জলে সামান্য আদা কুচি বা এক চিমটে গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে নিতে পারেন। এতে শরীরের উপর ঠান্ডার প্রভাব কম পড়ে।
শীতকালে ডাবের জল খাওয়ার বাড়তি কিছু উপকারিতা
ডাবের জল শরীর থেকে টক্সিন বের করে দিতে সাহায্য করে। কিডনি ও লিভারের কাজকে সহায়তা করে এই পানীয়। শীতে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে শরীরে বর্জ্য জমতে পারে, ডাবের জল এই সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।
এছাড়া নিয়মিত ডাবের জল খেলে মাথাব্যথা, ক্লান্তি এবং মন-মেজাজ খারাপ থাকার প্রবণতাও কমে। ব্যস্ত দিনের মাঝখানে এক গ্লাস ডাবের জল যেন শরীরের জন্য ছোট্ট বিরতি।
কারা শীতে ডাবের জল খাবেন না
যদিও ডাবের জল খুবই উপকারী, তবুও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সাবধানতা জরুরি।
যাঁদের ডাবের জল খেলে অ্যালার্জির সমস্যা হয়, তাঁদের এটি এড়িয়ে চলাই ভালো। কারও কারও ক্ষেত্রে পটাশিয়াম বা সোডিয়াম বেশি থাকায় শরীরে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
ডায়াবিটিস থাকলে প্রতিদিন ডাবের জল খাওয়া ঠিক নয়। কারণ এতে প্রাকৃতিক শর্করা বা ফ্রুক্টোজের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। নিয়মিত খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
কিডনির সমস্যা থাকলে ডাবের জল বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে খেতে হবে। এতে পটাশিয়াম বেশি থাকায় অতিরিক্ত খেলে ক্ষতি হতে পারে।
শীতে ডাবের জল রাখুন দৈনন্দিন অভ্যাসে
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডাবের জল শুধু গরমের জন্য নয়। শীতকালেও এটি শরীরের জন্য সমানভাবে প্রয়োজনীয়। সঠিক সময়, সঠিক পরিমাণ আর সঠিক নিয়ম মেনে খেলেই মিলবে আসল উপকার।
শীতের সকালে বা দুপুরের দিকে এক গ্লাস ডাবের জল শরীরকে রাখবে সতেজ, মনকে রাখবে চনমনে। ছোট এই অভ্যাসটাই হতে পারে সুস্থ থাকার বড় চাবিকাঠি।


