অসুখ হলেই অনেকেই এখন আর দেরি করেন না। ফার্মেসিতে গিয়ে নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খেয়ে নেন। মনে হয়, দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু এই অভ্যাসই ধীরে ধীরে শরীরের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে। তাই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নতুন নিয়ম আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নিয়ম শুধু রোগীদের জন্য নয়, চিকিৎসকদের জন্যও বাধ্যতামূলক হবে।
সম্প্রতি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়া নির্দেশিকা তৈরির কথা জানিয়েছে। তাদের মতে, যখন তখন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে অনেক ওষুধ আর আগের মতো কাজ করছে না।
ধরা যাক, কারও সামান্য জ্বর বা গলা ব্যথা হল। তিনি ভাবলেন, দ্রুত ভালো হতে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে মন্দ কী! এমনটা অনেকেই করেন। কিন্তু সব রোগেই অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। অনেক সময় ভাইরাসজনিত সমস্যায় এই ওষুধ কোনও উপকারই করে না। তবুও মানুষ নিজের ইচ্ছায় খেয়ে ফেলেন।
এই ভুল ব্যবহারই বড় সমস্যা তৈরি করছে। শরীরে থাকা জীবাণু ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফলে ভবিষ্যতে যখন সত্যিই অ্যান্টিবায়োটিক দরকার হবে, তখন সেই ওষুধ আর কাজ নাও করতে পারে। এই অবস্থাকেই বলা হয় ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’। এখন সারা বিশ্বে এই বিষয়টি নিয়ে গভীর চিন্তা শুরু হয়েছে।
আইসিএমআর বলছে, অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার আগে রোগের সঠিক কারণ জানা খুব জরুরি। রোগীর শরীরে ঠিক কী সংক্রমণ হয়েছে, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যাবে না।
সংস্থার প্রধান রাজীব বহেল জানিয়েছেন, রিপোর্ট না দেখে ওষুধ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। যদি রোগীর অবস্থা খুব খারাপ হয় এবং চিকিৎসক বুঝতে পারেন যে দেরি করলে বিপদ হতে পারে, তখন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যাবে। কিন্তু সেটা পুরোপুরি চিকিৎসা নীতিমালা মেনে করতে হবে।
আগে অনেক সময় চিকিৎসকেরা রোগীর উপসর্গ দেখেই অ্যান্টিবায়োটিক লিখে দিতেন। এখন সেই অভ্যাস বদলাতে হবে। প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক লেখার সময় কেন ওষুধটি দেওয়া হচ্ছে, তার পরিষ্কার কারণ উল্লেখ করতে হবে।
এতে রোগীও বুঝতে পারবেন কেন এই ওষুধ দরকার। পাশাপাশি ভবিষ্যতে চিকিৎসার ধারাও আরও পরিষ্কার হবে। অর্থাৎ, শুধু ওষুধ লেখা নয়, তার যৌক্তিকতা দেখানোও জরুরি হয়ে উঠছে।
শুধু চিকিৎসক নয়, ওষুধ বিক্রেতাদেরও দায়িত্ব বাড়ছে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনও প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দেওয়া হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বৈধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা যাবে না।
ধরা যাক, কেউ গিয়ে বললেন, “আগেও এই ওষুধ খেয়েছিলাম, আবার দিন।” এখন আর সেটা চলবে না। প্রেসক্রিপশন দেখে তবেই ওষুধ দিতে হবে। ডোজ, সময়—সব কিছু চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী মানতে হবে।
অনেক সময় চিকিৎসকরা রোগের ধরন পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই ওষুধ দিয়ে দেন। পরে দেখা যায়, রোগীর আসলে সেই ধরনের সংক্রমণই হয়নি। যেমন, কারও শরীরে ছত্রাক সংক্রমণ না থাকলেও তাকে অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ওষুধ দেওয়া হয়েছে। এতে রোগীর কোনও উপকার হয় না, বরং শরীরে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ জমে যায়।
এই কারণে এখন বলা হচ্ছে, যতটা সম্ভব আগে পরীক্ষা করতে হবে। রিপোর্ট দেখে তবেই সঠিক ওষুধ বেছে নিতে হবে।
চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদার এই বিষয়ে বড় সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রতি বছর শুধু ভারতে অসংখ্য শিশু অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণে মারা যাচ্ছে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ওষুধ আর কাজ করছে না।
ভাবুন, আগে যে ওষুধে দ্রুত জ্বর কমে যেত, এখন সেটা কোনও কাজই করছে না। তখন আরও শক্তিশালী ওষুধের দরকার হয়। কিন্তু সেগুলিও যদি একদিন কাজ না করে, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
এই সমস্যার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ আছে। মানুষ নিজের ইচ্ছায় ওষুধ খায়। আবার অনেকেই মাঝপথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। ধরুন, পাঁচ দিনের ওষুধ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু দুই দিনেই ভালো লাগায় আর খাওয়া হল না। এতে জীবাণু পুরোপুরি নষ্ট হয় না। বরং তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
একটা সহজ উদাহরণ দিলে বোঝা যায়। ধরুন, মাঠে আগাছা পরিষ্কার করতে গিয়ে অর্ধেক কেটে রেখে দিলেন। কিছুদিন পর দেখবেন, আগাছা আরও ঘন হয়ে গেছে। অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সচেতন না হলে সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। এমন সময় আসতে পারে, যখন সাধারণ সংক্রমণও মারাত্মক হয়ে উঠবে। কারণ, তখন হয়তো কোনও অ্যান্টিবায়োটিকই কাজ করবে না।
অর্থাৎ, ছোটখাটো অসুখও তখন ভয় ধরিয়ে দিতে পারে। তাই এখন থেকেই নিয়ম মেনে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
সবচেয়ে আগে মনে রাখতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণ ওষুধ নয়। এটা কোনও ব্যথার ট্যাবলেটের মতো নয়, যা ইচ্ছা হলেই খেয়ে নেওয়া যায়। অসুখ হলে আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তিনি যদি বলেন দরকার নেই, তাহলে নিজের ইচ্ছায় খাওয়া উচিত নয়।
আর যদি চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দেন, তাহলে পুরো কোর্স শেষ করতে হবে। মাঝপথে বন্ধ করা যাবে না। এতে শরীরের ক্ষতি কম হবে এবং ওষুধও তার কাজ ঠিকভাবে করতে পারবে।
এই নতুন নিয়ম আসলে আমাদের ভালো থাকার জন্যই। এটা কোনও বাধা নয়, বরং সুরক্ষা। যেমন আমরা ট্রাফিক নিয়ম মানি নিজের নিরাপত্তার জন্য, তেমনি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নিয়মও মানতে হবে সুস্থ থাকার জন্য।
আজ একটু সচেতন হলে আগামী দিনে বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। তাই যখন তখন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার অভ্যাস বদলাতে হবে। রোগী, চিকিৎসক, ফার্মেসি—সবাই একসঙ্গে দায়িত্ব নিলে তবেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।


