দেশে ওজন কমানো নিয়ে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। ঠিক এই সময়েই বড় খবর নিয়ে হাজির হচ্ছে আহমেদাবাদের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান Zydus Lifesciences। তারা খুব শিগগিরই বাজারে আনতে চলেছে সেমাগ্লুটাইড নামের নতুন একটি ওষুধ, যা দেখতে হবে ইনসুলিন পেনের মতো এবং একসঙ্গে দুই সমস্যায় কাজ করতে পারে—ওজন কমানো ও টাইপ–২ ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সব কিছু ঠিক থাকলে মার্চ মাসের মধ্যেই এই ওষুধ দেশের বাজারে পাওয়া যেতে পারে। ফলে যারা দীর্ঘদিন ধরে বাড়তি ওজন ও রক্তে শর্করা—দুই সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে নতুন আশা।
সেমাগ্লুটাইড কী এবং কেন এত আলোচনা?
সহজ ভাষায় বললে, সেমাগ্লুটাইড এমন একটি ওষুধ যা শরীরের ক্ষুধা ও বিপাকক্রিয়ার উপর কাজ করে। এটি ট্যাবলেট নয়, ইনজেকশন আকারে দেওয়া হবে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই—এটি এমন পেন-ডিভাইসের মাধ্যমে দেওয়া হবে, যা অনেকটা ইনসুলিন নেওয়ার মতোই সহজ।
ধরা যাক, আপনি ডায়েট করছেন কিন্তু বারবার ক্ষুধা লেগে যাচ্ছে। তখন যতই চেষ্টা করুন, খাওয়া কমানো কঠিন হয়ে যায়। সেমাগ্লুটাইড ঠিক এই জায়গাতেই কাজ করে। এটি শরীরকে এমন সংকেত দেয় যাতে ক্ষুধা কম লাগে এবং অপ্রয়োজনীয় খাওয়ার ইচ্ছাও কমে।
ফলে ধীরে ধীরে ক্যালোরি গ্রহণ কমে এবং ওজন কমতে শুরু করে।
কীভাবে কাজ করে এই ওজন কমানোর ইনজেকশন?
গবেষকদের মতে, এই ওষুধ শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের উপর প্রভাব ফেলে, যার নাম জিএলপি–১ (GLP-1)। এই হরমোন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের শরীরে তৈরি হয় এবং এটি মূলত তিনটি বড় কাজ করে—
প্রথমত, এটি ইনসুলিন নিঃসরণে সাহায্য করে
দ্বিতীয়ত, পাকস্থলীর খাবার খালি হওয়ার গতি ধীর করে
তৃতীয়ত, মস্তিষ্কে তৃপ্তির অনুভূতি বাড়ায়
আগে মনে করা হতো অগ্ন্যাশয়ের আলফা কোষ শুধু গ্লুকাগন হরমোন তৈরি করে, যা রক্তে শর্করা বাড়ায়। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এই কোষ থেকেই GLP-1 হরমোনও তৈরি হয়। আর এই হরমোন সক্রিয় হলেই ক্ষুধা কমে, বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং ওজন কমানো সহজ হয়।
সেমাগ্লুটাইড এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটাকেই শক্তিশালী করে দেয়।
ওজন কমানোর পাশাপাশি ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণ
এই ওষুধের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এটি শুধু স্লিম হওয়ার জন্য নয়, ডায়াবিটিস রোগীদের জন্যও উপকারী হতে পারে।
টাইপ–২ ডায়াবিটিসে সাধারণত শরীর ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না। ফলে রক্তে শর্করা বাড়তে থাকে। সেমাগ্লুটাইড ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং একই সঙ্গে অতিরিক্ত ক্ষুধাও কমায়।
একটা বাস্তব উদাহরণ ভাবুন। অনেক ডায়াবিটিস রোগী ওষুধ খেতে খেতে ওজন বাড়িয়ে ফেলেন। এতে আবার ডায়াবিটিস আরও খারাপ হয়। সেমাগ্লুটাইডের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটতে পারে—রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আবার ওজনও কমবে।
এই কারণেই চিকিৎসা মহলে ওষুধটি নিয়ে এত আলোচনা।
স্থূলত্বজনিত ডায়াবিটিসে নতুন আশা
যাদের স্থূলতার কারণে ডায়াবিটিস হয়েছে, তাদের জন্য এই ওষুধ বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।
স্থূলতা ও ডায়াবিটিস একে অপরের সঙ্গে জড়িত। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে। আবার ডায়াবিটিস থাকলে ওজন কমানো কঠিন হয়ে যায়। এই দুষ্টচক্র ভাঙতেই সেমাগ্লুটাইডকে সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ওষুধটি নিয়মিত নিলে—
ক্ষুধা কমবে
খাওয়ার পরিমাণ কমবে
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকবে
ওজন ধীরে ধীরে কমবে
সব মিলিয়ে জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে।
হৃদ্যন্ত্রের জন্যও উপকার?
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই ওষুধ হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রস্তুতকারী সংস্থার দাবি। কারণ, ওজন কমা ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ—দুটোই হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
তবে এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ফলাফল সামনে এলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
কারা নিতে পারবেন এই ওষুধ?
সবাই ইচ্ছামতো এই ইনজেকশন নিতে পারবেন না। নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড আছে।
যাদের বডি মাস ইনডেক্স (BMI) ৩০ বা তার বেশি, অর্থাৎ যারা স্থূলতার মধ্যে পড়েন, তারাই মূলত এই চিকিৎসার উপযুক্ত হতে পারেন। এছাড়া টাইপ–২ ডায়াবিটিস রোগীদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডোজ নিজে নিজে ঠিক করা যাবে না। চিকিৎসক রোগীর অবস্থা দেখে সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করবেন।
কী ডোজে আসছে সেমাগ্লুটাইড?
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে ১৫ মিলিগ্রাম / ৩ মিলিলিটার ডোজে ওষুধটি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সবার জন্য একই ডোজ হবে না।
কারও ক্ষেত্রে কম দিয়ে শুরু করে ধীরে বাড়ানো হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে আলাদা মাত্রা লাগতে পারে। তাই নিজের মতো করে ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে—এ কথা মনে রাখা জরুরি।
বাজারে কবে পাওয়া যাবে?
কেন্দ্রীয় ড্রাগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেলেই মার্চ মাসের মধ্যে ওষুধটি বাজারে আসতে পারে বলে জানা গেছে। স্বাস্থ্যখাতে যারা নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির খোঁজ রাখেন, তারা ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
তবে এখনো পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়নি—দাম কত হবে। দামই ঠিক করে দেবে সাধারণ মানুষের নাগালে এটি কতটা পৌঁছাতে পারবে।
ব্যবহার করার আগে যা মাথায় রাখবেন
যে কোনও নতুন ওষুধের মতো এটিও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নেওয়া ঠিক নয়। কারণ প্রতিটি মানুষের শরীর আলাদা।
বিশেষ করে যাদের—
আগে প্যানক্রিয়াসের সমস্যা ছিল
থাইরয়েড সংক্রান্ত রোগ আছে
গর্ভাবস্থা চলছে
অন্য গুরুতর অসুখ রয়েছে
তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
শেষ কথা
ওজন ও ডায়াবিটিস—এই দুই সমস্যাই এখন শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্র বাড়ছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং অনিয়ন্ত্রিত খাবারের কারণে অনেকেই এই সমস্যায় ভুগছেন।
এই পরিস্থিতিতে সেমাগ্লুটাইড যদি প্রত্যাশামতো কাজ করে, তাহলে এটি হতে পারে চিকিৎসা জগতের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তবে মনে রাখবেন, কোনও ওষুধই একা ম্যাজিক করতে পারে না। নিয়মিত হাঁটা, সুষম খাবার আর চিকিৎসকের পরামর্শ—এই তিনটিই আসল ভিত্তি।
ওষুধ সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সুস্থ জীবন গড়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদেরই।



