বর্তমানে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের কাছে ‘পিঙ্ক সল্ট’ বা ‘হিমালয়ান পিঙ্ক সল্ট’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একে কেউ বলেন সৈন্ধব লবণ, কেউ বলেন গোলাপি নুন। এই লবণ শুধু স্বাদ বা গন্ধে আলাদা নয়, বরং এর রয়েছে কিছু স্বাস্থ্যগুণ, যা অনেকের মতে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কিন্তু সত্যিই কি পিঙ্ক সল্ট ওজন কমায়? কীভাবে খেলে উপকার পাওয়া যাবে? সব জানুন বিস্তারিতভাবে।
পিঙ্ক সল্ট: গুণাগুণে সমৃদ্ধ একটি প্রাকৃতিক লবণ
পিঙ্ক সল্ট সাধারণত হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে পাওয়া যায়। এতে থাকে—
- ক্যালশিয়াম
- আয়রন
- পটাশিয়াম
- ম্যাগনেশিয়াম
এই খনিজ উপাদানগুলি শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। সাদা নুনের তুলনায় এতে সোডিয়ামের পরিমাণ কম থাকে, তাই এটি হার্টের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির অসুস্থতা থাকলে কিছুটা নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।
পিঙ্ক সল্ট ও ওজন নিয়ন্ত্রণ: কী বলছে গবেষণা?
২০১০ সালে ‘Journal of Sensory Studies’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, পিঙ্ক সল্ট শরীরের খনিজ ভারসাম্য বজায় রাখে এবং ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে এটি কোনও “ম্যাজিক ফ্যাট বার্নার” নয়। নিয়ম মেনে গ্রহণ করলে শরীর ডিটক্সে সহায়তা করে, যা ওজন কমানোর পথে সহায়ক হতে পারে।
পিঙ্ক সল্ট ব্যবহারের উপায়: কোন কোনভাবে খেলে উপকার বেশি?
১. পিঙ্ক সল্ট ডিটক্স ওয়াটার
- উপকরণ:
- ১ গ্লাস ঈষদুষ্ণ জল
- আধা চা-চামচ পিঙ্ক সল্ট
- ১ চামচ পাতিলেবুর রস
- খাওয়ার নিয়ম:
প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এই পানীয়টি পান করুন। এটি শরীর থেকে টক্সিন বের করতে সাহায্য করে এবং হজমে সহায়তা করে।
২. গ্রিন টি বা ক্যামোমাইল টি-তে পিঙ্ক সল্ট
- ১ কাপ গ্রিন টি বা ক্যামোমাইল টি-তে এক চিমটে পিঙ্ক সল্ট এবং অল্প আদা কুচি মিশিয়ে পান করুন।
- এটি হজমশক্তি বাড়ায়, অম্বলের সমস্যা কমায় এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
ডায়াবেটিক ও উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের জন্য কি পিঙ্ক সল্ট উপকারী?
ডায়াবেটিস থাকলে সোডিয়াম নিয়ন্ত্রিত ডায়েট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিঙ্ক সল্টে সোডিয়ামের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকায় এটি ডায়াবেটিকদের জন্য নিরাপদ হতে পারে।
ডায়েটিশিয়ান শম্পা চক্রবর্তীর মতে, “পিঙ্ক সল্ট উপকারী হলেও এটি অতিরিক্ত খাওয়া যাবে না। নুন যাই হোক না কেন, পরিমিত খাওয়াই শ্রেয়।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, প্রতি দিন সর্বোচ্চ ৫ গ্রাম (আধা চা চামচ) নুন গ্রহণই শরীরের পক্ষে উপযোগী। অতিরিক্ত নুন খেলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ ও কিডনির সমস্যা বেড়ে যায়।
সতর্কতা: কোন কোন অবস্থায় সাবধানতা জরুরি?
- হাইপারথাইরয়েডিজম: এই অবস্থায় নুন গ্রহণের পরিমাণ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
- কিডনির রোগ: সাদা নুনের বদলে পিঙ্ক সল্ট ব্যবহার কিছুটা নিরাপদ হলেও, নির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া নয়।
- নকল পিঙ্ক সল্ট কিনবেন না: গোলাপি রঙের দানার পাশাপাশি লেবেল ও উৎস দেখে যাচাই করে কিনুন। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম রঙ মিশিয়ে নকল পণ্য বিক্রি করা হয়।
পিঙ্ক সল্ট বনাম সাদা নুন: পার্থক্য কী?
| বৈশিষ্ট্য | পিঙ্ক সল্ট | সাধারণ সাদা নুন |
| খনিজ উপাদান | ক্যালশিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম | কেবল সোডিয়াম ক্লোরাইড |
| সোডিয়ামের পরিমাণ | কম | বেশি |
| স্বাদ | তুলনামূলক হালকা | তীব্র |
| স্বাস্থ্য উপকারিতা | ইলেক্ট্রোলাইট ব্যালান্স, হজমে সহায়ক | রক্তচাপ বাড়াতে পারে |
সারাংশে উপকারিতা:
- শরীর ডিটক্স করতে সাহায্য করে
- হজমপ্রক্রিয়া উন্নত করে
- রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
- শরীরে খনিজ উপাদানের ঘাটতি পূরণে সহায়ক
- পরিমিত খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে
শেষ কথা: উপকার পেতে হলে ‘মাত্রা’ বজায় রাখুন
পিঙ্ক সল্ট নিঃসন্দেহে একটি স্বাস্থ্যকর বিকল্প, কিন্তু মনে রাখতে হবে, এটি কোনও “ওজন কমানোর জাদুকরী উপাদান” নয়। সঠিক ডায়েট, শরীরচর্চা ও নিয়ম মেনে জীবনযাপন—এই সব কিছু মিলিয়েই সম্ভব ওজন নিয়ন্ত্রণ। পিঙ্ক সল্ট কেবল একটি সহায়ক মাধ্যম মাত্র।
স্বাস্থ্যবান থাকতে হলে ‘কম খান, বেছে খান, নিয়ম মেনে খান’। আর সব সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।


